সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর তাহিরপুরে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে । নির্বাচনে পরাজিত ভিন্ন ভিন্ন মেম্বার প্রার্থী কর্তৃক ওই উপজেলার ৩ ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ ও হুমকি দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পরাজিত মেম্বার প্রার্থী আলাউদ্দিনের সমর্থকরা টেকাটুকিয়া গ্রামে আক্রমণ করেছেন, বালিজুরি ইউনিয়নের পরাজিত মেম্বার প্রার্থী রেনু মিয়ার সমর্থকরা বড়খলা গ্রামে এবং তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের পরাজিত মেম্বার প্রার্থী সফিক মিয়ার সমর্থকরা চিকশা গ্রামের নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের বাড়িঘরে গিয়ে গ্রাম ছাড়ার হুমকি প্রদান করেছেন। টেকাটুকিয়া গ্রামের হামলায় সুকেশ বর্মন, ঋতুরাজ বর্মন, খেলন বর্মন ও অলকেশ বর্মন আহত হয়েছেন। এখানে ঘরের ভিতর ঢুকে মহিলাদেরও মারধর করা হয়েছে, গ্রামের মন্দিরে সরস্বতী মূর্তি ভাঙারও অভিযোগ উঠেছে। বড়খলা গ্রামের লিটন বর্মনসহ কয়েকজন রাতেই ভয়ে গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। গত সোমবার তাহিরপুর উপজেলার ৭ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পরদিনই পরাজিত মেম্বার প্রার্থীরা সংখ্যালঘুদের উপর এমন ন্যাক্কারজনক প্রতিশোধপরায়ণতায় মেতে উঠে। তাহিরপুরের এই তিনটি ঘটনায় শান্তিপ্রিয় মানুষ মাত্রই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনে পরাজয় বরণের পর শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর কেন এই হিংস্র উন্মত্ততা প্রদর্শন করা হলো? তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভোট দেননি বলে? তাহলে কি পরাজিত প্রার্থীরা ধরেই নিয়েছিলেন ওই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের ভোট দিতে বাধ্য? ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি এই আচরণ নুতন কোন ঘটনা নয়। সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের সমাজ জীবনে একেবারেই প্রান্তিক ও অপাঙক্তেয় অবস্থানে রয়েছেন। এই নিরীহ সম্প্রদায়ের লোকজনকে সর্বদাই কিছু লোক নিজের অধীন ভাবতেই পছন্দ করেন। তাই সহজেই তাদের উপর কারণে-অকারণে আক্রমণ পরিচালনা করা যায়, হুমকি দিয়ে গ্রাম ছাড়া করা যায়। এই মনোভাবের নিদারুণ দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে তাহিরপুরের তিন পল্লীতে। আরেকটি জিনিস উদ্বেগের। তিন ইউনিয়নের তিন গ্রামে একই ধরনের প্রতিশোধপরায়ণ ঘটনা ঘটানো থেকে বুঝা যায় এই ভেদমূলক মনোভাব বেশ শিকড় গেঁড়ে বসেছে। আমরা এইসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।
শুধু নির্বাচন নয় যেকোন তুচ্ছ ঘটনার কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ, তাদের মন্দির-মূর্তি ভাঙচুর করা এখন নিত্ত নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িযেছে। আমাদের সমাজ ক্রমশ তীব্র অসহিষ্ণু, অনুদার ও হিংস্র হয়ে উঠছে। এই মনোস্তত্ত্ব সমাজের একেবারে গভীরে গিয়ে প্রবেশ করেছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা অতীতে কোন রকম সামাজিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারেনি। বরং এই ভিন্নতা বৈচিত্রের সম্ভার নিয়ে আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে সর্বদা। আজ আমরা যে বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদধর্মী সমাজ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করছি তা আমাদের আসল পরিচয় নয়। এটি খুব কৌশলে সমাজে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা না বুঝে ওই বিষে আক্রান্ত হয়ে পড়ছি। মনে রাখতে হবে, এই ধরনের যেকোন বিভাজন আমাদের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য সাংঘাতিকভাবে বিপজ্জনক। সর্বনাশা এমন বিভাজনের বিরুদ্ধে সমাজের ভিতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিৎ। তাহিরপুরের মত বহু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর শান্তি ও সম্প্রীতিময় বসবাসের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা একেবারেই বেমানান। তাই তাহিরপুরের বিবেকবান মানুষজনকে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ রচনা করতে হবে।
তাহিরপুরের যে ৩ গ্রামের নিরীহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ ও হুমকি দেয়া হয়েছে, সেখানে এই অপকর্মের সাথে যারা জড়িত, প্রশাসনের দায়িত্ব তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ববোধ থেকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এইটুকু আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই।
- চলে গেলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আব্দুল হান্নান
- দোয়ারাবাজারে দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচিতে জেলা প্রশাসক

