তাহিরপুরে ১১ রোহিঙ্গা আটক করার ঘটনাটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন তাহিরপুর অঞ্চলে কেন কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গাদের এনে আশ্রয় দেয়া হচ্ছে সেটিও বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের গুটিলা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন কিছু রোহিঙ্গা। ওই গ্রামেরই তোতা মিয়ার ছেলে আলআমীন চট্টগ্রাম হাটহাজারি মাদ্রাসার ছাত্র। তিনিই এদেরকে তাহিরপুর নিয়ে আসেন। এই রোহিঙ্গাদের জন্মসনদসহ নাগরিক সনদ প্রদান করেছেন বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। হাটহাজারি মাদ্রাসার ছাত্র আলআমীন কর্তৃক রোহিঙ্গা পরিবারটিকে এখানে নিয়ে আসা, স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত না করে তাদেরকে আশ্রয়দান এবং সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বাদাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক নাগরিকত্ব সনদ প্রদান পর্যন্ত ঘটনাবলী রহস্যময়। পুলিশ একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে ধরতে সক্ষম হয়েছে সত্য, এরকম আরও পরিবার ওই এলাকায় রয়েছে কিনা সেটিও চিন্তার আরেকটি বিষয়। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারের উচিৎ পুরো বিষয়টিকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা।
মিয়ানমারে বর্বর গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীটি প্রাণ নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে অভ্যন্তরে ঢুকছে দলে দলে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে গত দুই সপ্তাহে চার লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এইসব শরণার্থীদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে অবস্থান করার কথা। ক্যাম্পের বাইরে চলে আসার কোন সুযোগ ও অধিকার নেই তাদের। দেশের বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপকভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে যে, এই গণহারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা ও চেহারাগত সমিলের কারণে আমাদের মূল জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যাওয়া এদের জন্য অনেকটাই সহজ। মিশে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি চলে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। সেই আশির দশকের গোড়া থেকেই। চট্টগ্রাম থেকে অন্তত ৫০০ কিলোমিটার দূরবর্তী তাহিরপুরে রোহিঙ্গাদের চলে আসা থেকে প্রমাণিত হয় তাদের এই মিশে যাওয়ার ¯্রােতটি কতোটা বিস্তৃত হয়েছে। সময় থাকতে সাবধান না হলে এর জের কতোটা গভীরে প্রবেশ করবে সেটি সক্রিয়ভাবে চিন্তা না করলে ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকানো অনেকটাই কঠিন হবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের জন্য এখন একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িযেছে। প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গার ভার বহনের মতো একটি কঠিন মানবিক কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কেবল হালকা উদ্বেগ প্রকাশ থেকে মানবিক সহায়তা দানের মধ্যে আটকে আছে। এদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করানোর জন্য দৃশ্যমান কোন আন্তর্জাতিক চাপ এখন পর্যন্ত তৈরি করানো যায় নি। অথচ আসল কাজ এটিই। ভিন্ন দেশের একটি পুরো জনগোষ্ঠী দশকের পর দশক ধরে এখানে থেকে যাবে, এটি কখনও উপযুক্ত বিষয় হতে পারে না। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুটির মানবিক দিককে সম্পূর্ণ স্বীকার করে এই সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করাটা এখন বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের বিশেষ কর্মসূচী হওয়ার যোগ্য। তাহিরপুরের মতো প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী ও দূরবর্তী একটি অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের আগমন থেকে এই উদ্যোগটি আরও বেশি গতি পাওয়া উচিৎ।

