বিশেষ প্রতিনিধি
ছয় কুড়ি কান্দা ও নয় কুড়ি বিল নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের সীমানা। একসময় কান্দাভর্তি সারি সারি হিজল, করচ আর নলখাগড়া চাইল্লা, বৌল্লা বন ছিল এই হাওরে। গত প্রায় ৩০ বছরে বন—বাদালি কাটতে কাটতে এবং হাজার হাজার গরু মহিষ চরিয়ে ধ্বংস হয়েছে নয় হাজার ৭২০ হেক্টর বন। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন বন নেই বললেই চলে। জেলা বন কর্মকর্তা চয়ন ব্রত চৌধুরী বলেছেন, এই হাওরে এক সময় নয় হাজার ৭২০ হেক্টর কান্দা ছিল, এর পুরোটাই ছিল বনাবৃত। টাঙ্গুয়ার হাওরে ৭ বছর বনায়নের দায়িত্ব পালনকারী সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডি (সিএনআরএস)’এর প্রকল্প সমন্বয়কারী এহিয়া সাজ্জাদ বলেছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন মাত্র ৩৫০ হেক্টর বনরকম ভূমি আছে। তাদের উদ্যোগে আরও ২০০ হেক্টর ভূমিতে বনায়ন করা হয়েছে। বন বিভাগ বলেছে, তারাও ২০০ হেক্টরে বনায়ন করেছেন। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এখন মাত্র ৭৫০ হেক্টর বন রকম ভূমি রয়েছে দেশের বিখ্যাত এই জলাভূমিতে।
রামসার কনভেনশন হলো বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ১৯৭১ সালে ইরানের রামসার নগরে প্রথম বিশ্বের পরিবেশবাদিদের সম্মেলন হয়। এটিই রামসার কনভেনশন নামে পরিচিত। সেখানে ‘কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস’ নামে একটি চুক্তিতে সই করেন অংশগ্রহণকারীরা। পরে ১৫৮টি দেশ এতে স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ সই করে ১৯৯২ সালের ২০ এপ্রিল। ১৯৯৯ সালে সরকার এ হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ( Ecologicallly Critically Area) ঘোষণা করে। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি টাঙ্গুয়ার হাওরকে রামসার সাইট ঘোষণা করা হয় ( Ramsar site-wetland of International Importance)। ২০১১ সালে এটিকে এটিপল Flyway site ঘোষণা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত দেশের দ্বিতীয় ‘রামসার সাইট’ এটি। প্রথমটি সুন্দরবন।

সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় এই হাওরের অবস্থান। ৪ টি ইউনিয়নের ১৮টি মৌজাজুড়ে এর আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। এরমধ্যে দুই হাজার ৮০০ হেক্টর জলাভূমি আছে। দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি এটি। এটি দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র ( Mother Fishery) হাওরে আগে ১২০ কান্দাবিশিষ্ট (পাড়) ১৮০টি বিল ছিল। এখন ছোট—বড় মিলিয়ে বিল আছে ১০৯টি। প্রধান বিল ৫৪টি। এর ভেতর জালের মতো ছড়িয়ে—ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল ও নালা। বর্ষায় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তখন হাওর যেন রূপ নেয় সমুদ্রে। এই এলাকার ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ হাওরের ওপর নির্ভরশীল। এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। এই পাহাড় থেকে ৩৮টি ঝরণা নেমে এসে মিশেছে টাঙ্গুয়ার হাওরে।

বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের কোন জলাভূমিতে বনায়ন উপযোগী এতো ভূমি নেই। তাদের মতে, এখানে নয় হাজার ৭২০ হেক্টর কান্দা রয়েছে। একসময় এর পুরোটাই ছিল বনাবৃত।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা সংঘ (আইইউসিএন)’এর কারিগরি সহায়তায় এবং এসডিপির অর্থায়নে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডি (সিএনআরএস)’এর বাস্তবায়নে সমাজভিত্তিক টাঙ্গুয়ার হাওর টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় এখানে ৭ বছর বনায়নের কাজ হয়েছে। এই প্রকল্পের দয়িত্বশীলরা বলেছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে এখনো ৩৫০ হেক্টর বনরকম ভূমি আছে। তাদের উদ্যোগে আরও ২০০ হেক্টর ভূমিতে বনায়ন করা হয়েছে।

সিএনআরএস’এর প্রকল্প সমন্বয়কারী এহিয়া সাজ্জাদের দাবি, হাওরের নুজরাই কান্দায়, কেশবপুরের কান্দায়, গোলাভারি কান্দায়, সারপিনের কান্দায়, আন্নাইর কান্দায়, হাতিরগাতা কান্দায় ২০০ হেক্টর ভূমিতে তারা বনায়ন করেছেন। যা এখনো বিদ্যমান আছ।
টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের জয়পুর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নুরুজ্জামান টাঙ্গুয়ার অতিতের স্মৃতি রোমন্থন করে বললেন, ‘২০ বছর আগে বাঘমারা কান্দায় ২০ টি মহিষ কে বা কারা ছেড়ে দিয়েছিল। শুনে আমরা অনেকেই কান্দার দিকে এগিয়ে যাই। ওখানে ১২ থেকে ১৬ হাত লম্বা নল, খাগড়া, চাইল্লা বন। কেউ মহিষ তাড়ানোর জন্য বনে ঢুকলো না। ওইদিন আমরা কয়েকটি বিষধর সাপ, মেছোবাঘ, বড় বড় কাউট্টা দেখতে পেয়েছি। এখন বাঘমারা কান্দায় বনের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। আশপাশের গ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে মানুষ বন কেটে নিয়ে গেছে। আমি নিজেও একবার ১৬ হাত লম্বা ২০ মণ নল কেটে ছাতক পেপার মিলে কাচামাল হিসাবে বিক্রি করেছি। গত প্রায় ২৫—৩০ বছর নল, বৌল্লা ও চাইল্লা কাটতে কেউ কাউকে বাধা দেয় নি। কার্তিক মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিজের পরিবারের জ্বালানী ও বিক্রির জন্য বিভিন্ন কান্দা থেকে বন কেটে নিয়েছে। এখন হাওরে প্রতিদিন অন্তত: লাখ খানেক গরু, পাঁচ হাজার মহিষ এবং এক—দুইশ’ ঘোড়া চরানো হয়।
হাওরপাড়ের গোলাভারি গ্রামের আব্দুল হালিম বললেন, চাইল্লা বন, বৌল্লা বন, নল—খাগড়া মাথার অনেক উপড়ে উঠতো, বর্ষার সময় ঢেউ হলে বনের ভেতর নৌকা নিয়ে আশ্রয় নেওয়া যেতো। বন—বাদালি পানির নীচে গেলে মাছ আশ্রয় নিতে পারতো, ঘেউর (শ্যাওলা) হতো, মাছ খাদ্য পেতো। তিনি জানালেন, টাঙ্গুয়ার বর্তমান ওয়াচ টাওয়ার থেকে রূপাবই বিল পর্যন্ত বাঘামরা কান্দা ছিল। ২৫—৩০ বছর আগে ওই দিকে কেবল জঙ্গল আর জঙ্গল ছিল। চাইল্লা বন, নলখাগড়া, বন তুলসি, বৌল্লা বনের জন্য এই কান্দায় যেতে ভয় লাগতো। এখন এই দিকেই মানুষের যাতায়াত পথ। পুরুষ—মহিলা সকলেই যাতায়াত করেন এই পথে।
হাওরপাড়ের গোলাভারির রফিক মিয়া বললেন, গোলাভারি—জয়পুর থেকে ছোট বেলায় হাঁটতে হাঁটতে লামাগাঁও যেতাম। মাছ খাওয়ার লাগি বৈধর, কাইম, দামাল পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে বিলে নামতো, মাছ খাবার জন্য মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই এরা জঙ্গলে ঢুকে যেতো। এখন আর বনও নেই। পাখিও নেই।
হাওরপাড়ের শ্রীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোদাচ্ছের আলম সুবল বললেন, ১৯৮৪ সালে একবার বাঘমারা কান্দায় যাই। বন টেলে টুলে কিছু জায়গা যেতেই কালাবৈদর, ইটাছড়ি, ডাহুকসহ নানা জাতের হাজারো দেশি পাখি উড়ে সরতে দেখেছি। এখন এসব কেবল স্মৃতি।
জেলা বন কর্মকর্তা চয়ন ব্রত চৌধুরী বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা কখনোই যথোপযোগী ছিল না। বছরের পর বছর বন বা গাছগাছালি কেটে নিতে এখানে তেমন কোন বাধা ছিল না। হাজার হাজার বন কর্তনকারীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় নি। বন বিভাগেরও কোন উদ্যোগ ছিল না। যারা বনায়ন ও বন সংরক্ষণ বিষয়ে গবেষণা করেন তাদেরকে বিশাল এই বনায়ন রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ করতে যুক্তও করা হয় নি। এসব কারণে ক্রমেই এটি বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। তার মতে এটি রক্ষা করতে হলে বিশষেজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরিকল্পিত পরিকল্পনা করে ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। তিনি দাবি করলেন, ২০০৯ সাল থেকে থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩০০ হেক্টরের মতো কান্দার ভূমিতে তারাও মুক্তা, হিজল, খরচ, বরুণ গাছ লাগিয়েছেন।
বন্যপ্রাণি গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত উপ—প্রধান বন কর্মকর্তা ড. তপন কুমার দে বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পরিকল্পিত বা সমন্বিতভাবে কাজ কম হয়েছে। ওখানে নানা সংস্থা কাজ করেছে, স্টাডির কাজ করেছে আইইউসিএন, জলাভূমি অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠনের কাজে সমন্বয় কম ছিল। বনায়নের কাজও তেমন হয় নি। পানি নেমে যাওয়ার পর পরই মাটি ভেজা থাকতে থাকতে ওখানে বন্যা সহনীয় বৃক্ষ যেমন হিজল, খরচ, ইটালি, বরুণ, অজুর্ন, জারুল, রেন্টি লাগানো জরুরি ছিল। সেটিও পর্যাপ্তভাবে হয় নি। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ওখানে বনায়ন করতে হবে। বনায়নের ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগকেই দিতে হবে, তারা সেটি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালনও করতে হবে। বিদেশী সংস্থার অর্থ সহায়তায় কোন উন্নয়ন সংগঠনকে ওখানে কাজের দায়িত্ব দিলে ‘হালুয়ারুটির ভাগবাটোয়ারা’ হবে।
জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, জেলার বিভিন্ন হাওরের ইজারাদার অর্থাৎ যারা মাছের চাষ করেন তাদের অনেকে প্রশাসন ও হাওরের পাহাড়ায় নিয়োজিত আনসার পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের বন বৃক্ষ কেটে নিয়ে গেছে। এ কারণে বন বৃক্ষ কমেছে। সমন্বয়হীনতার কিছু বিষয় আগের কাজে থাকতেও পারে বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসকও। এখন যা হবে পরিকল্পিতভাবেই হবে জানিয়ে তিনি বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের সুরক্ষায় বড় ধরণের কাজ হবে। জলবায়ু ট্রাস্ট্র ফান্ড থেকে অর্থ দেওয়া হবে। ইউএনডিপির সহায়তায় ওখানে বনায়ন হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ হবে। গ্রামবাসীদের মধ্য থেকে ভলান্টিয়ার নিয়োগ হবে। তাদেরকে সম্মানীসহ প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ দেওয়া হবে। এই হাওরের সুরক্ষায় সকলকেই মনোযোগী হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তথ্য নিয়েও মতভিন্নতা
বন বিভাগের দেওয়া কান্দার পরিমান নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেন সিএনআরএস’র প্রকল্প সমন্বয়কারী এহিয়া সাজ্জাদ। তিনি বললেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে ৬ মাস সার্ভের কাজ করে দেখা গেছে, ওখানে কান্দা, চাষাবাদকৃত জমি ও নয়কুড়ি বিলসহ আয়তন নয় হাজার নয়শ’ ৯৭ হেক্টর। কান্দার যে হিসাব বন বিভাগ দিচ্ছেন, এই তথ্য সঠিক নয়। আমাদের জরিপে ওখানে এক হাজার ৭১৭ হেক্টর কান্দা রয়েছে। বন রকম ভূমি আছে ৩৫০ হেক্টর, বনায়ন হয়েছে আরও ২০০ হেক্টর ভূমি। নতুন করে বনায়ন করতে চাইলে গোচারণ ভূমি ও বন্দোবস্তকৃত ভূমি বাদ দিয়ে ৮০০ হেক্টরের মতো বনায়ন করা যাবে।
তিনি দাবি করলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের ব্যবস্থাপনা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। স্থানীয়ভাবে জেলা প্রশাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখনো জেলা প্রশাসন ব্যবস্থাপনায় আছে। ভূমি মমন্ত্রণালয় এই জলাভূমির মালিক। তারা বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করেছে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে কারিগরি সহায়তার জন্য আইইউসিএনকে সঙ্গী করেছিল। আইইউসিএন সিএনআরএস এবং আরেকটি উন্নয়ন সংগঠন অ্যাপোর্স ফর রুরাল এডভান্সমেন্ট (ইরা) কে যুক্ত করেছিল। সিএনআরএস ন্যাচারেল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এনআরএম) এর কাজ করেছে। তার মতে টাঙ্গুয়ার হাওরে কাজের ক্ষেত্রে সফলতা ব্যর্থতা দুটোই আছে। ব্যর্থতার কারণও আছে। মূলত সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ধারণাটি সরকার এবং জনসাধারণ কোন পক্ষই ধারণ করতে পারেন নি। সমন্বয়হীনতা হয়ে থাকলে দায় বন বিভাগেরও আছে দাবি করে এই উন্নয়ন কর্মকর্তা বললেন, প্রতি মাসেই টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বন বিভাগের প্রতিনিধিও থাকতেন। তাহলে সমন্বয়হীনতার দায়ভার তাদের উপরও বর্তায়।
জেলা বন কর্মকর্তা চয়ন ব্রত চৌধুরী, টাঙ্গুয়ায় কান্দার জমি কমতে পারে। বন্দোবস্ত, বাড়িঘর, চাষাবাদের জন্য দখলসহ আরও কিছু কারণে কান্দার জমি কমতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি দাবি করেছেন, টাঙ্গুয়ার হাওর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বন বিভাগকে কখনোই ডাকা হয় নি। তিনি জানালেন, একবছর হয় এই জেলায় আসলেও একবারও তিনি এই সংক্রান্ত কোন সভায় আমন্ত্রণ পান নি।


