খলিল রহমান
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। আমাদের গর্ব ও অহংকারের ধন। হাওর-জনপদ সুনামগঞ্জের মানুষ। আমাদের আপনজন। কিন্তু আমার এমনই কপাল তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে মাত্র একবার। এটাই প্রথম, এটাই শেষ। তাঁর গানে আমার মন মজে, হৃদয় নাচে। নিশি রাতে বন্ধুদের জমজমাট আড্ডায় করিমে মাতি আমরা। তাঁর গান ছাড়া প্রাণে টান আসেনা, ভাব আসেনা। তিনি অন্তর জুড়ে আছেন। এই অন্তরের মানুষটিকে দেখার একটা টান ছিল। ব্যাকুল পিপাসা ছিল আমার। কেন দেখা হয়নি এর আগে, এই ভেবে আমি কূল পাইনা।
আমাকে এক রাতে সিলেট থেকে ফোন করেন শ্রদ্ধাভাজন মইনুদ্দিন আহমদ জালাল। আমাদের প্রিয় জালাল ভাই। তিনিও আমাদের সুনামগঞ্জের মানুষ। দিনটি ছিল ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল । পরদিন দিরাইয়ে যেতে হবে। আমি বলি, উৎসবের রিপোর্ট করবেন আমাদের সিলেট প্রতিনিধি সুমনকুমার দাস। যাঁরা দিরাইয়ের উজানধল গ্রাম থেকে বাউল করিমকে দেশে-বিদেশে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম এই তরুণ কবি ও গবেষক সুমনকুমার দাস। এরপরও জালাল ভাই যখন বলেছেন, তখন যেতেই হবে। তিনি রাতেই সুনামগঞ্জ চলে আসেন। সকালে সুমন গাড়ি নিয়ে আসবেন সুনামগঞ্জে। এরপর সবাই যাবো দিরাইয়ে, এই পরিকল্পনা হয়। সকালে সুনামগঞ্জ শহরের হোটেল জালালাবাদের সামনে যখন মাইক্রো নিয়ে সুমন হাজির তখন দেখি সহযাত্রী হিসাবে আছেন বন্ধুবর জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের তখনকার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ। খুশি হই এই সাংবাদিক-জনপ্রতিনিধিকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে। বলাবাহল্য আমি এর আগে উজানধলে যাইনি কখনো। দিরাই শহর পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি যখন উজানধলের দিকে যাচ্ছে তখন চোখ জুড়িয়ে যায়। হাওরের মাঝখান দিয়ে ‘ডুবন্ত সড়ক’। এই পাকা সড়ক ছয়মাস হাওরের থই থই জলের নিচে ডুবে থাকে। এখন সড়কের দুই পাশে সবুজ ধান খেত। ধানের কচি পাতা দূলছে বাতাসে। আকাশে রোদেরা খেলা করছে। নানা বয়সী মানুষ একই পথের পথিক। সড়কের ওপর বাউল সম্রাটের ছবিসহ রঙিন ফেস্টুন। কাছাকাছি যেতেই চোখে পড়ে উৎসবস্থল। গোটা এলাকা, হাওর, প্রকৃতি আর মানুষের এই উৎসব। দুপরের দিকে আমরা মেলা মাঠে পৌঁছাই।
চারদিকে ফসলের সবুজ সমারোহ। বইছে বসন্ত বাতাস। সবুজের মাঝখানে এক চিলতে সবুজ মাঠ। মাঠজুড়ে হাজারো মানুষ। নারী-পরুষ শিশু সব বয়সের। খানিকদূরে বাড়ির উঠানের কিনারে দাঁড়িয়ে মাথায় আঁচল টেনে উঁকি দিচ্ছে গায়ের বধূ। এর মাঝে মঞ্চে একজোড়া শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে উদ্বোধন হলো উৎসবের। একদিকে শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে শান্তির আহবানে উৎসবের উদ্বোধন আর অন্যদিকে বাড়িতে বিছানায় শুয়ে ভক্তকূলের জন্য মঙ্গল কামনা করছেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। যাঁকে ঘিরে এই আয়োজন। বাউল সম্রাটের শরীরটা ভালো নেই, তাই তিনি উৎসবস্থলে আসতে পারেননি। আমার মন খচখচ করে ওঠে। আমি তাঁর বাড়ি যেতে চাই।
বাড়ির পাশেই উজানধল গ্রামের মাঠ। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বাউল সম্রাটের প্রিয় নদী কালনী। মাঠে চলছে উৎসব। বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, সেখানেও ভক্তদের ভিড়। উঠানে চলছে খাওয়া-দাওয়া। কোনো ধরাবাধা নেই। টেবিলে বসলেই দেওয়া হচ্ছে খাবার। ঘরে বিছানায় শুয়ে আছে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। ভক্তরা তাঁর বিছানার পাশে গিয়ে হাত ধরে আর্শীবাদ চাইছেন। তিনি ভক্তদের আর্শীবাদ করছেন। তবে খুব একটা কারোর সাথেই কথা বলছেন না বাউল সম্রাট। আসার সময় ভক্তদের হাতে একটি করে ফল দিয়ে দেন তিনি। ভক্তরা তা শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করেন।
আমিও ঘরে ঢুকি। তখন সংগীতশিল্পী মাকসুদ বসা। মাকসুদ উঠে গেলে আমি সম্রাটের বিছানার পাশে গিয়ে বসি। দীর্ঘকায় মানুষটিকে এই প্রথম দেখা। উৎসব মাঠ থেকে ভেসে আসছে তাঁর গানের মন মাতানো সুর, ‘দিবানিশি ভাবি যারে তারে যদি পাইনা, রঙের দুনিয়া তরে চাইনা…।’ তাঁর হাত ধরে একেবারে কাছাকাছি যাই। বলি- ‘মাঠে হাজার হাজার ভক্ত, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন আপনার টানে, তাঁদের জন্য কিছু বলুন’। সম্রাট চোখ তুলে তাকান। খানিকক্ষণ নীরব থাকার পর বলে ওঠেন,‘জগতের সকলের মঙ্গল হোক।’
বেলা শেষের দিকে। বাড়ি ফেরার টান। কিন্তু মন মানে না। আরও কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করে। এক সময় বের হয়ে আসি ঘর থেকে। বাইরে তাকাই। মানুষের ‘মায়া’ আমাকে আচ্ছন্ন করে। একটা অপরাধ বোধ মনে উঁকি দেয়। আমার আরও আগে আসা উচিত ছিল সম্রাটের দরবারে। বারবার আসা উচিত ছিল। এরপর আবার যাই ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। তখনো শাহ আবদুল করিম আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তবে তাঁর দেহে প্রাণ ছিল না। আমাদের চোখে ছিল অশ্রু, মনে অন্তুহীন শূন্যতা। বিকেলের শান্ত ছায়ায় এক বুক শূন্যতা নিয়েই সেদিন সুনামগঞ্জে ফিরতে হয়েছিল। এরপর কত-শতবার গিয়ে উজানধলে। কিন্তু প্রতিবার ফেরার সময় সেই শূন্যতা আমাকে ঘিরে ধরে। বকুটা খালি খালি লাগে। এই শূণ্যতার মধ্যেও বাউল করিম লুকিয়ে আছেন অন্তরে। তিনি প্রকাশিত হন তাঁর গানে। গানের সুরে সুরে ওঠে আসেন মানুষের প্রেমে-দর্শনে, আনন্দ-বেদনায়।
লেখক: সাংবাদিক-আইনজীবী, সুনামগঞ্জ
- তাহিরপুরের হাওর ও পুকুরে ৩০৭ কেজি পোনামাছ অবমুক্ত
- বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো শাহ আবদুল করিম স্মরণ উৎসব


