তুমি রবে সগৌরবে

এনাম আহমেদ অ্যাডভোকেট
স্বাধীনতা ও বিজয়ের রজত জয়ন্তী উৎসব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুরো জাতি। এই উৎসবের মধ্যমনি হচ্ছেন সারাদেশের অল্প ক’জন জীবিত মুক্তিযোদ্ধা। এরমধ্যে বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু এক কিংবদন্তি। তিনি একাধারে বীর মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী সমিতির প্রাণ ভোমরা, লেখক, গবেষক, সমাজসংস্কারক, প্রতিবাদি-সফল সংগ্রামী। কিন্তু আকস্মাৎ এই নক্ষত্রের পতন!
১৯৭১ সালে তিনি টগবগে ১৯ বছর বয়সের তরুণ। মেতে ছিলেন খেলাধুলায়, সাংস্কৃতিক চর্চায়, ছাত্র রাজনীতিতে। সেখান থেকে কি-না একেবারে দেশের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে! তিনি ভারতে গিয়ে রেঙ্গুয়া গ্রামের পাশে হাইড ক্যাম্পে ট্রেনিং নেন। ৫নং সেক্টরের অধীন সেলা (বাঁশতলা) সাবসেক্টর ছিলো তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র। যাঁর নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী (পরবর্তীতে লে. জেনারেল)। সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন এ.এস হেলাল উদ্দিন (পরবর্তীতে লে. কর্নেল)। এরা দুজনই তাঁকে খুব ¯েœহ করতেন। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরী আক্রমণের পূর্বে ফ্যাক্টরীর ভেতরে পাকিস্তানী সৈন্যদের অবস্থান ও গোলাবারুদ সম্পর্কে রেকি করার দায়িত্ব তাঁরা তাঁকে দেন। এসময় দেশ বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের যুদ্ধ পরিচালনা কৌশল তিনি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত ঘটে আব্দুল হক, বরুণ রায়, পীর হাবিবুর রহমান, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মতিয়া চৌধুরী, হোসেন বখত, ওবায়দুর রাজা চৌধুরী, আব্দুজ জহুর, আলফাত উদ্দিন মুক্তার সাহেবের সঙ্গে। তিনি সম্মুখ সমরে অংশ নেন ছাতক ও টেংরাটিলায়।
বজলুল মজিদ খসরু’র জন্ম ভাষা আন্দোলন পরবর্তী এক উত্তাল সময় ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে। বাবা মফিজুর রহমান চৌধুরী ছিলেন কৃষিজীবী। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হন। তিনি সিলেট জেলা দায়রা জজের জুড়ি সদস্য হিসেবেও কাজ করেন। মা মজিদা খাতুন চৌধুরী। ৫ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ তে ম্যাট্রিক, ১৯৬৯ এ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭২ সালে একই কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলা, বইপড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে মেতে থাকতেন। স্থানীয় প্রান্তিক নাট্যগোষ্ঠী, শিল্পীচক্রের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করেছেন। ১৯৭৪ সালে আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সুবচন নির্বাসনে’ নাটকে তিনি সর্বশেষ অভিনয় করেন। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ১১ দফা আন্দোলন সহ সকল আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে কলেজ সংসদের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা থেকে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে যখন সুনামগঞ্জে এসে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা ইকরামউল্লা সরকারের পরামর্শে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে চলে যান। সেখানে ৫ বছর অবস্থানকালে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ পান। খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন প্রবাসীদের পাওয়া না পাওয়ার সুখ-দুঃখ-বেদনা। এনিয়ে রচনা করেছেন ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’ নামে সুখপাঠ্য একটি ভ্রমণ কাহিনী। জার্মানি ছাড়াও তিনি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম হল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, চীন, সৌদিআরব, ভারত প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দীর্ঘ সময় পৃথিবীর একটি অন্যতম সমৃদ্ধ দেশে সুখ সাচ্ছন্দে থেকেও নাড়ির টানে ১৯৮৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। শুরু করেন আইনপেশা। এই সফল আইনজীবী ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০০ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭-২০০৯ (তত্বাবধায়ক সরকার) কালে সুনামগঞ্জ জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পি.পি’র দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৪ সালে সুনামগঞ্জ মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য পদ লাভ করেন। তিনি “আলফাত উদ্দিন রিক্সা শ্যীমক স্মৃতি ট্রাস্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক।
ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পূর্বে দৈনিক সংবাদ এবং স্বাধীনতার পর দৈনিক পূর্বদেশের সুনামগঞ্জস্থ সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ‘সাপ্তাহিক সুনাম’ তাঁর সম্পাদনায় বের হয়। পত্রিকাটি প্রায় ৮ বছর চালু ছিলো।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দৈনিক ‘সুনামগঞ্জের খবরের’ এর উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির সাথে যুক্ত। বিভিন্ন ম্যাগাজিন সম্পাদনা সহ লেখালেখিতে তাঁর পারদর্শিতা সকলকে মুগ্ধ করেছে। ২০১২ সালে সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণাধর্মী বই ‘রক্তাক্ত একাত্তর সুনামগঞ্জ’ প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালে প্রকাশ করেন ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’। এছাড়াও তাঁর সম্পাদনায় ‘একাত্তরের সুনামগঞ্জ’, ‘বরুণ রায় স্মরক গ্রন্থ’, ‘আলফাত উদ্দিন আহমদ স্মারক গ্রন্থ’ ও ‘হোসেন বখত স্মারক গ্রন্থ’ প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে দোয়ারাবাজারের লক্ষ্মীপুর গ্রামে সাবসেক্টর কমান্ডার এএস হেলাল উদ্দিন এবং নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাই স্কুল’। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলালউদ্দিন শিক্ষা ট্রাস্ট’র জন্মলগ্ন থেকেই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক ও সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, ডায়বেটিস এসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমী, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেক্টর কমান্ডার্স গঠন হওয়ার পর তিনি সুনামগঞ্জ জেলার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক কাজ হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্ত ভাতা না নিয়ে সেটাকে সেবামূলক কাজে ব্যয় করা। এ জন্য তাঁরা ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা (বরুণ রায়, হোসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, আছদ্দর চৌধুরী, রানা চৌধুরী এবং তিনি নিজে) ভাতার টাকায় গড়ে তুলেছেন গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নামে একটি সামাজিক সেবামূলক সংগঠন। দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া, গবির মানুষের চিকিৎসা খরচ, পথশিশুদের শিক্ষা উপকরণ দেওয়া সহ বিভিন্ন সফল মানুষদের সম্মাননা দেয়া হয় ট্রাস্টের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে হাওর বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কারণে শতভাগ ফসলহানি হওয়ায় প্রতিবাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলেন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন। তিনি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রত্যুষে পায়ে হেঁটে শরীরচর্চা করার জন্য তিনি সহ আরো অনেকে গড়ে তুলেন ‘সোনালী সকাল’ নামে একটি সংগঠন। ব্যতিক্রধর্মী এই সংগঠনটি শহরে খুব প্রশংসিত হয়। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রাণপ্রদীপ। জীবনের শেষ দিনেও তাঁরা সবাই একসঙ্গে হেঁটেছেন, আনন্দ করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৮৬ সালে সংসার জীবন শুরু করেন। তাঁর স্ত্রী মুনমুন চৌধুরী একজন কবি ও সংগঠক। এক ছেলে ড. সউদ ফারহান চৌধুরী দীপ আমেরিকায় ইনটেল কোম্পানীতে একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। মেয়ে সারাফ ফারহিম চৌধুরী দীয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবি অনার্স শেষ করে বর্তমানে এলএলএম করছেন। পাশাপাশি ড. কামাল হোসেন এসোসিয়েটসে এপ্রেন্টিস হিসেবে কর্মরত।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশের পরিবর্তিত গতিপথ দেখে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হন। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশ এখন সঠিক পথেই এগুচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। পৃথিবী এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও বদলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সেদিন বেশী দূরে নয়, যখন পৃথিবীর সেরা নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ভালো ডিগ্রি নিয়ে আমাদের ছেলে মেয়েরা দেশেই তাঁদের যোগ্য কাজ খুঁজে পাবে।
তাঁর মধ্যে অনেক ব্যক্তিসত্বার একত্র সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়। তাঁর সচল জীবন ও আজীবন কর্ম তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। সারা জীবন সৎ ও সুন্দর অভ্যাসের ভালো মানুষ তিনি। তাঁর মৃত্যু সুনামগঞ্জবাসীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এবার জেলা শহরে মুক্তিযুদ্ধের রজত জয়ন্তী উৎসবের মূল মশালটিই যেনো নিভে গেলো।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর, সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি, সুনামগঞ্জ।