তৃতীয় দফা জলাগ্রাসনের পূর্বাভাস, শহররক্ষা বাঁধ ও খাল উদ্ধারে মনোযোগী হোন

তৃতীয় দফা তথাকথিত বন্যার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগের পরিনামে দুই দুই বার এই শহর ও হাওরাঞ্চল পানি আগ্রাসনের শিকার হয়। এখনও একনাগারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যাদের ঘরে এর আগে পানি ঢুকে গিয়েছিলো, যারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, পানি নামার পর যারা সাফসুতরো করে ফিরেছিলেন আপন ঘরে; তাদের বুক আবার ঢিপঢিপ করতে শুরু করেছে। তারা অজানা আশঙ্কায় বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন আর কিছুক্ষণ পরপর পানির স্তর নিরীক্ষণ করছেন। এদিকে করোনা আক্রান্ত সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ শহরে। করোনা ও মনুষ্যসৃষ্ট বন্যা মিলে ২০২০ সনটিকে দুর্বিসহ করে তুলেছে। ১৯৮৮ ও ২০০৪ সনে আমরা বড় আকারের প্রাকৃতিক বন্যা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। সেই সময়ের তুলনায় পানির চাপ অনেক কম থাকলেও এবারের দুর্ভোগ সেই সময়কার মতই। কেন দুই চার দিনের বৃষ্টিপাতে জনপদ জলমগ্ন হয় সে নিয়ে নাগরিক সমাজে বহু আলোচনা হচ্ছে। এসব আলোচনার মুখ্য পয়েন্ট হলো, খাল ও নালা দখল, নদীগর্ভ ভরে যাওয়া, পানি প্রবাহের ব্যবস্থা না রেখে যত্রতত্র রাস্তা নির্মাণ, ফসলরক্ষা বাঁধগুলো কেটে না দেয়া ইত্যাদি। এসব কারণকেই অল্প বৃষ্টিতে দুঃসহ পানিবন্দিত্ব তৈরি হওয়ার কারণ হিসাবে সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো- এসব সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী কার্যপরিকল্পনা ও উদ্যেগের অনুপস্থিতি। আমরা খুব বেশি অদূরদর্শী জাতি। তাই দূর নিয়ে ভাবতে পারি না, সুদূরপ্রসারী কাজে হাত দেই না। একই সাথে আমরা স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে সাময়িক উপসম করার চিন্তায় নিয়োজিত থাকি। মানুষের পানি বন্দিত্বে আমরা কয়েকটি আশ্রয়শিবির আর কিছু রান্না করা বা শুকনো খাদ্য বিতরণকে একমাত্র কর্তব্য জ্ঞান করি। এতে তাৎক্ষণিক বাহবা পাওয়া যায়, কিছুটা সমাজসেবার পুলক অনুভব করা যায়। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয় না। সমস্যার সমাধান যে পথে সেই পথে হাঁটার সাহসই আমরা দেখাতে পারছি না। শহরের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর দখল উদ্ধারের জন্য নেই বিন্দুমাত্র উদ্যোগ। আমরা জানি যারা খাল দখল করেছেন তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কম নয়। এদের স্বার্থে আঘাত করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু কঠিন হলেও তো তা করতে হবে। করতে হবে এ কারণে যে এই শহরটিকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে তুলতে হবে। জেলা প্রশাসক কামারখাল দখলকারীদের তালিকা তৈরি করে রেখেছেন বলে আমরা জানি। কিন্তু উচ্ছেদের ছক না আঁটলে ওই কাগুজে তালিকার মাহাত্ম্য কী? জনপ্রতিনিধি ও রাজনীতিকরা কেন এ ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছেন না? তাঁরা সোচ্চার হলে প্রশাসনের পক্ষে খাল উদ্ধার কাজ শুরু করা সহজ হয়। খালগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিলে শহরের পানিবন্দি দশা লাঘব হত বলে সকলেই মনে করেন।
জলাগ্রাসনের এই সময়ে শহরের কিছু রাস্তায় শুরু হয়েছে খুড়াখুড়ি। কয়েকটি রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এই ভরা বর্ষায় কেন রাস্তা খুড়াখুড়ি? সরকারি বরাদ্দ প্রাপ্তি, টেন্ডার করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সময় লাগে আমরা জানি। তাই বলে খুড়াখুড়ির এই কাজটি কি আরও দুই সপ্তাহ পরে শুরু করা যেত না? অর্থবছর তো শেষই হয়ে গেছে। তাই জুলাই মাসে কাজ শুরু করলে যা আগস্টে শুরু করলেও তাই হত। কিছু রাস্তা বন্ধ থাকার কারণে অন্য রাস্তাগুলোয় যে অসহনীয় ভিড় তৈরি হয়েছে তা করোনা সংক্রমণের জন্যও অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই শহরকে তথাকথিত নিত্য বছরের বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী সমাধানের দিকে মনোযোগী হতে আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। সুরমা নদীর তীর বরাবর বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। খাল উদ্ধার করতে হবে। পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এ লক্ষে একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন। রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজ এই কাজে কার্যকর সহযোগিতা দিন। তবেই হাওর ও নদী অববাহিকার এই ছোট্ট শহরটি তথাকথিত বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে।