তৈরি হচ্ছে অর্ধশতাধিক বিলাসবহুল নৌকা

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
নৌকায় ওঠেই ড্রয়িং রুম, মাঝখানে করিডোর, দুইপাশে তিনটি করে বেড রুম। এরমধ্যে বাথরুমসহ দুটি বেড রুম, অন্যগুলোর জন্য দুটো কমন বাথ রুম। উপরে খোলা থাকেবে, তবে সেখানে (উপরে) বাশ ও বেতের সোফা যুক্ত হবে। কিচেন রুমটা দেখলেই যাতে পছন্দ হয় সেভাবেই তৈরি হচ্ছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের রহিমাপুর গ্রামের পাশে হাওরাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর পর্যটকবাহী নৌকা তৈরির সময় কাঠমিস্ত্রি এভাবেই বিবরণ দিলেন। বর্ষার নৌকা বানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামালগঞ্জের দুই গ্রামের অন্তত ৩০-৩৫ জন কাঠমিস্ত্রি। তাদের কাঠপেটানো হাতুড়ির শব্দে এখন মুখর কর্মস্থলের চারপাশ। একই ধরণের কর্মচঞ্চলতা সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার টুকেরঘাট এলাকা ও তাহিরপুরের সোলেমানপুর গ্রামের আশপাশ এলাকা।
মাসখানেক ধরে তিনটি স্থানে নির্মীয়মাণ ৪০ টি নৌকায় দিন-রাত নিরলস কাজ করছেন কাঠমিস্ত্রিরা। বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু স্থানে একই ধরনের নৌকা তৈরি হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে অর্ধশতাধিক পর্যটকবাহী নৌকা তৈরি হচ্ছে সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে।
হাওরে ঘুরতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে আধুনিক সুবিধা সম্বলিত কাঠের তৈরি বৃহৎ আকৃতির বিলাসবহুল এই বিশেষ নৌকা তৈরি দেখতে ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষেরা।
একেকটি নৌকা তৈরিতে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মতো ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। এতে কর্মহীন কাঠমিস্ত্রিদেরও বাড়তি আয়ের পথ সুগম হয়েছে। এছাড়া দৃষ্টিনন্দন এই নৌকা বর্ষায় পানি টইটুম্বুর হাওরের সৌন্দর্য বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে। রাজধানী ঢাকার উদ্যোক্তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হাওরাঞ্চলের বেকারদের কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বর্ষায় ভাটি অঞ্চলে চলাচলের একমাত্র ভরসা নৌকা। তবে চারপাশে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হওয়ায় বর্তমানে ভাটির জনপদে নৌকা নির্ভরতা অনেকটা কমে এসেছে। তাই কাঠমিস্ত্রিদের নৌকা বানানোর ব্যস্ততাও কমে গেছে। আগের মতো কাঠমিস্ত্রি পাড়া থেকে হাতুড়িপেটা শব্দ আর ভেসে আসে না। বিগত এক দশকে হাওরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটায় পূর্বপুরুষ থেকে চলে আসা কাঠমিস্ত্রিদের ঐতিহ্যবাহী পেশায়ও মন্দাভাব ধরেছে। এতে করে কাঠমিস্ত্রিদের অনেকে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ কেউ আবার পুরোনো পেশা আকড়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন।
এবারের হেমন্তে জেলার তিনটি এলাকায় নৌকা বানাতে তুমুল ব্যস্ততা কাজ করছে কাঠমিস্ত্রিদের মাঝে। যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। নৌকা তৈরিতে কেউ কাঠে পাতাআম ঠুকছেন, কেউবা কাঠ চিলে নৌকায় লাগানোর উপযোগী করে গড়ে তুলছেন। কাঠমিস্ত্রিদের যতন স্পর্শে কয়েকটি নৌকা পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ধারণ করেছে। আর কয়েকটির অবকাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে এবং বাকিগুলো তৈরিতে কাঠসহ সরঞ্জামাদি আনা হয়েছে।
হাওরপাড়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বর্ষায় যখন সুনামগঞ্জের হাওরগুলো ডুবে যায় তখন অন্যরকম সৌন্দর্য বিরাজ করে। হাওরভর্তি পানির বুকে নিভৃতে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল-করচ আর ডুবে যাওয়া হাওরে গেঁথে থাকা সুনসান গ্রামগুলো উদার চিত্তে আমন্ত্রণ জানায় পর্যটনপ্রিয় মানুষকে। বর্ষাকালীন সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন সুনামগঞ্জের বৃহৎ হাওর টাঙ্গুয়াসহ ছোট-বড় অন্যান্য হাওরের পানি টইটুম্বুর দৃশ্য দেখতে। হাওরজলে ঘুরতে আসা সৌখিন মানুষদের আরামদায়ক পর্যটন সুবিধা নিশ্চিতসহ ব্যবসা প্রসারের লক্ষে বিশেষ সুবিধা সম্বলিত এমন নৌকাই বানাচ্ছেন রাজধানী ঢাকার উদ্যোক্তারা।
নৌকায় কাজ করা কাঠমিস্ত্রিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুনামগঞ্জের কয়েকটি স্থানে এরকম অন্তত ৫০টিরও বেশি নৌকা বানানো হচ্ছে। একেকটি নৌকার দৈর্ঘ্য ৮০ থেকে ৯০ ফুট হবে। একেকটি নৌকা তৈরিতে খরচ হবে আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। ভিন্ন ভিন্ন নমুনায় তৈরি হবে এসব নৌকা। হাওরে ঘুরতে আসা দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসু মানুষদের আগ্রহ বাড়াতে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন উদ্যোক্তারা। বর্ষায় টাঙ্গুয়া ও হাকালুকির মতো বৃহৎ হাওরে এসব নৌকা চলবে।
হরিহরপুর গ্রামের কাঠমিস্ত্রি দলের প্রধান অনিত সূত্রধর বললেন, ৭টি নৌকার অর্ডার পেয়েছি। এগুলো তৈরিতে দৈনিক ১০-১৫ জন মেস্তুরি কাজ করছে। ইতিমধ্যে ৩টি নৌকার কাজ অর্ধেকেরও বেশি শেষ হয়েছে। বাকিগুলোর কাজও চলছে। এগুলো দৃষ্টিনন্দন ভিআইপি নৌকা হবে। যে কেউ দেখলেই আকৃষ্ট হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, তার বড় ভাইও ১০-১২ টি নৌকার অর্ডার পেয়েছেন। তিনি সুনামগঞ্জ সদরের টুকেরবাজারে কাজ করছেন।
রহিমাপুর গ্রামের হরকুমার সূত্রধর জানিয়েছেন, তিনি ৪টি নৌকার অর্ডার নিয়েছেন। জুগালো (সহকারী) নিয়ে দুইটির কাজ তিনি বাড়িতে করছেন আর দুইটির কাজ টুকেরবাজারে ছেলে করছে। তার প্রতিবেশী রতন সূত্রধরও কয়েকটি নৌকার কাজ পেয়েছেন। এগুলোর কাজ রহিমাপুরেই করা হচ্ছে। নৌকার কাজ পাওয়ায় মেস্তুরি হাঁটির প্রায় সবাই এখন ব্যস্ত। এতে তারা বাড়তি আয়ের দেখা পেয়েছেন।
নৌ পর্যটন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান- মহাজনের নাও’র স্বত্বাধিকারী ও টাঙ্গুয়ার অভিযাত্রিক অপারেশন্স কোর্ডিনেটর মাসুক উর রহমান বললেন, হাওরভাটির ঐতিহ্যবাহী পাতাম নৌকার খোলের উপর কারিগরি ফলিয়ে হাউসবোটের আদলে এই নৌকাগুলো তৈরি করা হচ্ছে। পর্যটকদের জন্যে কেবিন সুবিধাসহ নৌকা বর্তমানে ৬ টি আছে। এছাড়া বড় আকারের পাতাম নৌকা, ছোট আকারের পাতাম, ধানী টেম্পো নৌকা মিলিয়ে প্রায় ২০০ নৌকা টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটক বহন করে থাকে। এবছর রাজধানী ঢাকার উদ্যোক্তাদের মধ্যে অভিযাত্রিক ট্যুরিজম লিমিটেড, মহাজনের নাও, জলযাত্রা, প্ল্যান-বি ট্যুরিজম, ব-বোট, গ্রিনবেল্ট, জোছনাতরী, মনজুড়ানির এক্সপ্রেস, জাদুকাটা বোট, কেরালা বোট ইত্যাদি নামের উদ্যোক্তাসহ স্থানীয় অনেক উদ্যোক্তারাও পর্যটকবাহী নৌকা তৈরি করছে। এসব নৌকায় ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। আগামী বর্ষায় এসব নৌকাগুলো পর্যটকদের নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান হাওর, খরচার হাওর, টেকেরঘাট, শহীদ সিরাজ লেক, জাদুকাটা নদী, বারেকেরটিলা প্রভৃতি স্থানে ঘুরবে।