থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে …

এস ডি সুব্রত
বাবা মার পরপর চারটি সন্তানের মৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হয়। সংসারের নানা দু:খ কষ্টের মধ্যে জন্ম নেয়ায় সন্তানটির নামা রাখা হয় দুখু মিয়া। ছোট্ট সেই দুখু মিয়াই হচ্ছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবি ১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ফকির আহমদ এবং মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। ফকির আহমদের ছিল তিন ছেলে আর এক মেয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবিই ছিলেন না। তিনি গীতিকার, সুরকার, সাংবাদিক, রাজনীতিবীদ, সৈনিক এবং দার্শনিকও ছিলেন। দুই বাংলায় তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। আমরা তাঁকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক মর্যাদা দিলেও শিশুসাহিত্যেও কাজী নজরুল ইসলামের অবদান কম নয়। ‘ভোর হলো দোর খোল/ খুকুমণি ওঠ রে/ ওই ডাকে জুঁই শাখে/ ফুলখুকি ছোট রে’ কবিতার মধ্যে দিয়েই কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছোটদের পরিচয় ঘটে। সব ছোট ছেলে মেয়ারাই মায়ের কাছে এই কবিতা শুনে থাকবে।
মাত্র আট বছর বয়সে নজরুলের বাবা মারা যান। ছন্নছাড়া হয়ে যায় তাঁর শৈশব। ছোট থেকেই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে। কখনও লেটো দলে গান গেয়েছেন, কখনও মসজিদে কাজ করেছেন। ছোট থেকেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল দুঃখ-দুর্দশা। তবু তিনি হেরে যাননি। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে নিয়েছিলেন দৃঢ় মনোবল ও সাহস দিয়ে।
নজরুলের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়। স্থানীয় এক মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করেছেন। একটু বড় হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতায় যোগ দেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে থাকা অবসস্থায় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। এসময় তিনি প্রকাশ করেন তাঁর ঐতিহাসিক বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মত কবিতা। একারণে তাকে জেলেও যেতে হয়েছে।
ছোটদের জন্য অনেক মজার ছড়া লিখেছেন নজরুল। তার লেখা পিলে পটকা, খাঁদু-দাদু, মট্কু মাইতি, লিচুচোর আর খুকি ও কাঠবিড়ালীর মতো শিশুতোষ মজার ছড়া এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ছোটদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাঁর হারানো শৈশবকে খুঁজে পেতেন নজরুল। শিশুদের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি চির শিশু, চির কিশোর।’ সেজন্যই তিনি সহজ ভাষায় শিশুদের জন্য যে কোনও সময় লিখতে পারতেন মজার মজার ছড়া-কবিতা-গান।
শিশুদের মনের কথা বুঝতে পেরেই হয়তো তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি/সবার আগে কুসুম-বাগে/উঠব আমি ডাকি!/সুয্যি মামা জাগার আগে/উঠব আমি জেগে,/হয়নি সকাল, ঘুমো এখন,/মা বলবেন রেগে।’ তাঁর এই কবিতাটি শোনেনি এমন লোক খুব কমই আছে বাঙালিদের মধ্যে। নজরুলের খুকি ও কাঠবিড়ালী কবিতা লেখার পেছনে রয়েছে এক গল্প। তিনি যেখানেই যেতেন শিশুদের সঙ্গে তাঁর বন্ধু গড়ে তুলতেন। ১৯২১ সালে তিনি কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। উঠেছিলেন ইন্দ্র কুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। ইন্দ্রবাবুর একটি মেয়ে ছিল অঞ্জলি নামে। নজরুল একদিন দেখলেন এই মেয়েটি একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে উপরে তাকিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। নজরুল কাছে গিয়ে দেখলেন মেয়েটি একটি কাঠবিড়ালীর সঙ্গে কথা বলছে। তিনি অবুঝ মেয়েটির সারল্য দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি লিখলেন, খুকি ও কাঠবিড়ালী কবিতাটি। ১৯৭২ সালে তিনি সপরিবারে ঢাকা আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তিনি ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
কবি পাখির ডানায় ভর করে উড়ে বেড়াতে চান দেশ হতে দেশান্তরে। সুন্দর এই পৃথিবীর সব কিছু দেখতে চান দু’চোখ ভরে। তাই কবি লিখেছেন, ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে/ দেখব এবার জগৎটাকে/ কেমন করে ঘুরছে মানুষ/ ঘুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।’
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ