বিশেষ প্রতিনিধি ও এনামুল হক
দলীয় প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা আওয়ামী লীগে। সংগঠনের নেতা কর্মীরা দুই ভাগে (দলীয় ও বিদ্রোহী) বিভক্ত হওয়ায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন ভোটাররা। প্রার্থীদের কেউ এসে দলীয় প্রতীকের সম্মান রক্ষার অনুরোধ জানাচ্ছেন, কেউবা দীর্ঘদিন দলে নিজের ত্যাগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ভোট চাইছেন। এই দুই উপজেলার ১০ ইউনিয়নের নয়টিতেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের সমর্থকরা বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেবার অভিযোগ ওঠেছে। জেলা আ.লীগের নেতাদের মন্তব্য, ধর্মপাশা মধ্যনগরে আওয়ামী লীগের বিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘এমপি লীগ’। এই ১০ ইউনিয়নে আগামী ৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ।
ধর্মপাশা সদর ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক জুবায়ের পাশা হিমু। একই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আব্দুল হেকিম চৌধুরীর ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফখরুল ইসলাম চৌধুরী বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। জুবায়ের পাশা হিমুর পক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের একটি অংশ কাজ করলেও কোনো কোনো নেতাকর্মী প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় ফখরুল ইসলাম চৌধুরীকে শোকজ করেছে জেলা আওয়ামী লীগ।
সেলবরষ ইউনিয়নে কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান তালুকদার দলীয় মনোনয়ন পেলেও একই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলা উদ্দিন বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন। একারণে সেখানেও তার সমর্থিত নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন।
স্থানীয় সাংসদের নিজ ইউনিয়ন পাইকুরাটিতে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সহ-সভাপতি এমএমএ রেজা (পহেল) দলীয় মনোনয়ন পেলেও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মোজাম্মেল হক ইকবাল বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। মোজাম্মেল হক ইকবালকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।
জয়শ্রী ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এটিএম নাজিম উদ্দিন আল আজাদ দলীয় প্রার্থী সঞ্জয় রায় চৌধুরীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন।
সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল জব্বারের ছেলে যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। জাকির হোসেন যুবলীগের পদ থেকে বহিস্কার হয়েছেন। একই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ হোসেন দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন। এছাড়াও উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মনীন্দ্র চন্দ্র তালুকদারের ছেলে উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহিত লাল তালুকদার মুন বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় দলীয় প্রার্থী নাসরিন সুলতানা দীপার জয় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জাকির হোসেন, সৈয়দ হোসেন দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন।
সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি সেলিম রেজা চৌধুরী দলীয় মনোনয়ন পেলেও তার বিরোধীতা করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোকাররম হোসেন। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় মোকাররম হোসেনকে শোকজ করেছে জেলা আওয়ামী লীগ।
মধ্যনগর ইউনিয়নে দলের বিপক্ষে মাঠে আছেন মধ্যনগর আওয়ামী লীগের সদস্য সঞ্জিব তালুকদার টিটু। তাকেও দল থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। দলীয় প্রার্থী প্রবীর বিজয় তালুকদার টিটুর সঞ্জিত তালুকদার টিটুর কারণে বেকায়দায় রয়েছেন।
চামরদানি ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে আলমগীর খসরু নামের একজনকে। যিনি গত নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। এই ইউনিয়নের বিদ্রোহী প্রার্থী একেএম আসাদুজ্জামান রোকন দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন। যদিও তিনি নিজেই দল থেকে নিজের সদস্য পদ প্রত্যাহার করেছেন বলে প্রচার দিচ্ছেন। এছাড়াও মধ্যনগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রভাকর তালুকদার পান্নাও বিদ্রোহী হিসেবে দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন।
বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়নে মধ্যনগর আওয়ামী লীগের সদস্য সাজেদা আহমেদের স্বামী রাসেল আহমেদ এবং মধ্যনগর যুবলীগের তথ্য গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক বিপ্লব বিশ্বাস দলীয় প্রার্থী আজিম মাহমুদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। বিপ্লব বিশ্বাস দল থেকে বহিস্কার হয়েছেন, অবশ্য তিনি বহিস্কারের আগেই দল থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নে দলীয় নেতা আনোয়ার হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও স্থানীয় নেতা কর্মীরা তার পক্ষে প্রচারণায় নেই।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বললেন, ধর্মপাশার ৬ ইউনিয়নের মধ্যে কেবল জয়শ্রী ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্টজনদের প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে, অন্য সকল ইউনিয়নে বিদ্রোহী নিয়ে নেমেছেন সংসদ সদস্যের সমর্থক ও স্বজনরা। তিনি বললেন, সংসদ সদস্যের ভাই উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন রুখন, আরেক ভাই আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন মাসুদ, উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাফিজ আলী প্রকাশ্যে দলীয় প্রার্থীদের বিরোধীতায় নেমেছেন। প্রত্যেক ইউনিয়নে নির্বাচনে মুখোমুখী এখন আওয়ামী লীগ এবং এমপি লীগ।
মধ্যনগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ চন্দ্র সরকার বললেন, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের তিনটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ট ৩ প্রার্থী বিদ্রোহী হিসাবে লড়ছেন। আরেকটিতে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নেমেছেন এমপি সাহেবের সমর্থকরা।
ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বিলকিস বললেন, আওয়ামী লীগ- এমপি লীগ নয়। তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে মনোনয়ন দেওয়ায় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। তিনি বললেন, শামীম আহমদ মুরাদ কিছুদিন আগে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন, তিনি ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের তিন নম্বর যুগ্ম সম্পাদক, দলের বক্তব্য দেবার এখতিয়ার তার নেই।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বললেন, দলীয় মনোনয়ন দেবার পর, প্রার্থী হারলে সকলেরই দায় নিতে হয়। দলীয় সংসদ সদস্যগণ দলীয় মনোনীতদের সঙ্গে নেতা কর্মীদের সমন্বয় করে দেবার কথা। তারা কেউ কেউ উল্টো করছেন, হয় বিদ্রোহী প্রার্থী নামিয়েছেন, না হয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নেতা কর্মীদের নামিয়ে দলীয় প্রতীকের অসম্মান করছেন। ধর্মপাশা মধ্যনগরে দলীয় প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করে প্রায় সকল ইউনিয়নে সংসদ সদস্যের সমর্থকরা নেমেছেন। ওখানে এমপিলীগ তৈরি করে নির্বাচনে নামিয়েছেন তিনি। ব্যারিস্টার ইমনের পাশে বসা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানও বললেন, দলের প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে নামানো হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বললেন, ধর্মপাশা-মধ্যনগরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এই কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। চারবারের এমপির ছেলে ধর্মপাশা সদরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পায় না, পাইকুরাটি ও সেলবরসে বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েক ইউনিয়নে হাস্যকর প্রার্থী হয়েছে। এই কারণে ক্ষুব্ধ নেতা কর্মীরা। দলীয় মনোনয়ন প্রদানে কোন না কোনভাবে বিনিময় হয়েছে। না হয় এ ধরণের প্রার্থীকে নৌকা দেবার কথা নয়। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নিজেদের পিঠ বাছানোর জন্য এখন আবুল-তাবুল বখছেন।
- নতুন বইয়ের জন্য স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভিড়
- মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে ভারত সরকারের দেয়া আইসিইউ এম্বুলেন্সের যাত্রা শুরু


