দলের দুই পক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করছেন

বিশেষ প্রতিনিধি
দ্বিতীয় ধাপে সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারা উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভালো করতে পারে নি আওয়ামী লীগ। দলের ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ইউনিয়নগুলোতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। ছাতকের ১০ ইউনিয়নের ৮ টিতেই আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। এরমধ্যে ৪ জন পরাজিত হয়েছেন। এই উপজেলায় ৩ বিদ্রোহী, ২ বিএনপি নেতা এবং জামায়াতের ১ জন জয়ী হয়েছেন। দোয়ারাবাজার উপজেলায় অবশ্য ৯ ইউনিয়নের ৩ টি আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ছিলেন, এবার ৫ জন হয়েছেন, বিদ্রোহী ৩ টি এবং ১ টিতে বিএনপি নেতা জয়লাভ করেছেন। এই উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত দুই বর্তমান চেয়ারম্যান ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে জয়ী হলেও, এবার তাদের ভরাডুবি হয়েছে। দলের প্রার্থীদের এমন অবস্থার জন্য প্রার্থী নির্ধারণে ত্রুটির কথা বলেছেন দলের একাংশ, অপরাংশ বলেছেন কোন্দলের কারণে পরাজয় হয়েছে। নির্বাচনের পর একে অপরকে দোষারোপ করছে দলের দুইপক্ষ।
দলের একাংশ বলেছেন, প্রার্থী নির্ধারণে ত্রুটি ছিল, মনোনয়ন বাণিজ্যও হয়েছে। ১৪ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হিসেবে মাঠে ছিলো এক বা একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী। তৃণমূল, উপজেলা, স্থানীয় সংসদ সদস্য বা জেলা নেতাদের কোন উদ্যোগ ছিল না এই বিদ্রোহ ঠেকাতে। এ কারণে যা হবার তা হয়েছে।
ছাতক আওয়ামী লীগের একাংশের নেতা শামীম আহমদ চৌধুরী বললেন, অনেক ইউনিয়নে জনপ্রিয় প্রার্থীকে না দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুগত হওয়ায় অযোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে ড্যামি প্রার্থীর হাতে নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে। এসব কারণে দলীয় প্রতীক নৌকার অসম্মান হয়েছে। তৃণমূলে, উপজেলায় এবং জেলায় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত ছিলেন তারা এজন্য দায়ী।
ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ফজলুর রহমান বললেন, প্রার্থী মনোনয়নে ভুল ছিল না, বর্তমান চেয়ারম্যান বা বিগত নির্বাচনের দলীয় প্রার্থী, যিনি কিনা সামান্য ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন তাদের নাম তৃণমূল থেকে না দিলে প্রশ্ন ওঠবে। ৩-৪ জনের নামের মধ্যে তাদের নাম গেছে। তারা স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড থেকে সঙ্গত কারণে মনোনয়নও পেয়েছেন। মনোনয়ন পেলেও ইমেজ সংকটের কারণে ভোট পান নি এরা। ভোটের প্রচারণায় উপজেলা বা জেলা নেতাদের কোন ত্রুটি ছিল না।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের দাবি ভোটের ফলাফল ভালো হয়েছে এই উপজেলায়। আগে তিন জন ছিল দলের চেয়ারম্যান ছিলেন, এখন ৫ জন হয়েছে।
এই উপজেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নাম না ছাপার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, উপজেলার দুটি ইউনিয়নে মনোনয়ন বঞ্চিত দুই বর্তমান চেয়ারম্যানকে জেতানোর জন্য, অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে নৌকা তুলে দেওয়া হয়েছে, দলের প্রতীক নিয়ে এমন হাস্যকর উদ্যোগে ওই দুই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের ভোটাররা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দলের প্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান এই দুই প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে তৃতীয় বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট বলেছেন, মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তৃণমূলে। টাকা নিয়ে নৌকার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এজন্য বিদ্রোহী প্রার্থী বেড়েছে। দলীয় প্রতীক দিলেও অজনপ্রিয় প্রার্থীকে ভোট দেয় নি দলের সমর্থক ভোটাররা। ছাতক ও দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্যকে দলের এই অবস্থার জন্য দায়ী করেন তিনি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন, তৃণমূলের দেওয়া নামই সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। দলের প্রার্থীর সংগে সংগঠনের ভেতর থেকেই বিরোধিতা করা হয়েছে। ছাতকে দল সুশৃঙ্খল ছিল না, এখন কাজ হচ্ছে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ করার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছাতক- দোয়ারার সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বললেন, মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য নয়, এমন প্রার্থীও নৌকা পেয়েছেন, যার ৫ হাজার টাকা দেবারও ক্ষমতা নেই। একাধিক প্রার্থী নৌকা প্রত্যাশী ছিলেন। মনোনয়ন দেবার পর এদের সকলকে সমন্বয় করে দিতে সংগঠনের উদ্যোগ কম ছিল। ছাতকে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের উপর বিএনপি ভর করেছিল। বিএনপি এবং জামায়াতের যারা জয়ী হয়েছে, তারাও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলে জয়ী হতো না, তারা ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ভোট নিয়েছে।