বিশেষ প্রতিনিধি
প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। গেল ২৮ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় নেতাদের বিশ^াস-অবিশ^াসকে ঘিরেই এই বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। মত ভিন্নতার জের ধরেই গত পহেলা জানুয়ারি পৌর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রঞ্জন ও উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান মোহন চৌধুরীক বক্তব্য দেবার সুযোগ দেওয়া হয় নি। দলের নেতাদের অভিযোগ ছিল এই দুজন ‘দিনে নৌকা, রাতে ছিলেন মগ প্রতীকের সমর্থক’।
দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তির সুর তৈরি হয় গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন থেকেই। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়কে গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী করা হয়। বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ায় প্রার্থীতার বিষয়ে আওয়ামী লীগ কিছুটা শিথিল থাকায় এখানে দলের উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী কয়েকজন প্রার্থী হন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলতাব উদ্দিন, দলীয় নেতা মঞ্জুর আলম চৌধুরী এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায় প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে জয়ী হন মঞ্জুর আলম চৌধুরী। প্রদীপ রায় ৬৩ ভোটের ব্যবধানে হারেন। যুবলীগের রঞ্জন হন তৃতীয়।
নির্বাচনের পর অনেকেই বলেছেন, দিরাইয়ের আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একই বলয়ের দুই নেতা প্রদীপ ও রঞ্জন প্রার্থী থাকায় প্রদীপ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। এরপর থেকেই প্রদীপ ও রঞ্জনের দূরত্ব তৈরি হয়।
গেল ২৮ ডিসেম্বরের পৌর নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায়ের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা বিশ^জিৎ রায়কে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্মসম্পাদক বর্তমান মেয়র মোশারফ মিয়া বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক দিরাইয়ে নির্বাচনী সভায় মোশারফ মিয়াকে বহিস্কারের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পরও দলের কিছু নেতা কর্মী মোশারফ মিয়ার পক্ষে প্রকাশ্য প্রচারণায় অংশ নেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ধনীর রায় ও শঙ্খর নাগ। নির্বাচনী প্রচারণায় কেউ কেউ দিনে নৌকার পক্ষে আবার রাতে জগের নীতি নির্ধারণী সভায় থাকতেন বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ ওঠে।
রাজনৈতিক সচেতন এই পৌরসভায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকার মান বাঁচাতে শেষ মূহূর্তের প্রচারণায় এসে অংশ নেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিক, কেন্দ্রীয় সদস্য আজিজুস সামাদ আজাদ ডন, সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির ইমন, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিনসহ সংগঠনের দায়িত্বশীররা। নির্বাচনে বিশ^জিৎ রায় ১৫৩ ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচত হন। নৌকা প্রতীক নিয়ে বিশ^জিৎ রায় ৫৯১০ ভোট পান। বিদ্রোহী প্রার্থী মোশারফ মিয়া জগ প্রতীকে পান ৫৫৫৭ ভোট।
নির্বাচনে বিশ^জিতের ঘাম জড়ানো জয়ে খুশী হন নি আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী ও সমর্থকরা।
তারা মনে করেন, দলের কিছু নেতাকর্মীর বিশ^াস ঘাতকতার কারণেই নৌকার জয় পেতে বেগ পেতে হয়েছে। একারণে নির্বাচনী পরবর্তী সময়ে (পহেলা জানুয়ারি) উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় উপজেলা যুবলীগের সভাপতি বিশ^জিৎ রায় ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিশ^জিত রায়কে বক্তব্য দেবার সুযোগ দেওয়া হয় নি।
উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার বললেন, ‘উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যারা নৌকার বিরোধীতা করেছিল, তারাই পৌরসভায়ও নৌকার বিরোধীতা করেছে। দিনে নৌকায় ওঠেছে, রাতে জগ হাতে নিয়ে ঘুরেছে এরা।’
তিনি আওয়ামী লীগ নেতা ধনীর রায় ও শঙ্খর নাগের প্রকাশ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে থাকার কথা জানিয়ে বলেন, উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি তাজুল ইসলামও তার ভাই স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল হকের পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন। আব্দুস সাত্তার জানান, দলের ক্ষুব্ধ নেতা কর্মীরা এ কারণে পহেলা জানুয়ারিতে দলীয় কার্যালয়ের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় রঞ্জন রায় ও মোহন চৌধুরীকে বক্তব্য দিতে দেয় নি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সিরাজ উদ দৌলা তালুকদার বললেন,‘ পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল বিভক্ত হয় নি। দলের নেতা কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছেন। দল ঐক্যবদ্ধ থাকায় কঠিন অবস্থার মধ্যেও নৌকার জয় হয়েছে। বিএনপি ও বিদ্রোহীরা মিলেও নৌকার জয় ঠেকাতে পারে নি। উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায় দিনে নৌকার উঠোন বৈঠকে থাকলেও রাতে নৌকার জয় ঠেকাতে ষড়যন্ত্র করেছেন দাবি করে তিনি বলেন, ভোটাররাই এসব তথ্য জানিয়েছেন দলের নেতা কর্মীদের। তিনি জানালেন, রঞ্জন রায়কে বলে কয়ে নৌকার উঠোন বৈঠকে আনা হতো। তিনি নৌকার পক্ষে ভোটযুদ্ধে শরীক হন নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তার উপস্থিতিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভায় পৌর নির্বাচনে দলীয় কিছু নেতা কর্মীদের এমন ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করে জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে সব কিছু জানানো হবে বলে জানান তিনি।
উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রঞ্জন রায় বললেন, নৌকা শেখ হাসিনার এবং দলের প্রতীক, এজন্য আমি বিশ^জিত রায়ের প্রচারণায় ছিলাম। আমি নৌকার পক্ষে প্রচারণায় থাকার প্রমাণের অভাব নেই। কিন্তু যারা বলছেন আমি নৌকার বিরোধীতা করেছি, তারা কোন প্রমাণ দেখাতে পারবেন না। মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন এরা। আমাদের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এবং জয়া সেন গুপ্তার নির্বাচনে যারা নৌকার বিরোধীতা করেছিল, এবারের পৌর নির্বাচন পরিচালনায় তারা ছিল কর্ণধার। নির্বাচনের প্রচার সভায় আমাকে বক্তব্য দিতে ডাকা হয়েছে, নীতি নির্ধারন সভায় আমাকে এড়িয়ে চলা হতো। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভায় আমাকে ও মোহন চৌধুরীকে বক্তব্য দেবার সুযোগ দেওয়া হয় নি। দলের বিভাজন প্রকাশ্য করে দিচ্ছে দলের ভেতরকার অনুপ্রবেশকারীরা।
বিদ্রোহী প্রার্থী মোশারফ মিয়া বললেন, নির্বাচনে দলীয় নেতা ধনীর রায় ও শঙ্কর নাগ নয়, আরও অনেকেই আমার সঙ্গে ছিল। দলের নেতা কর্মীরা আমার সঙ্গে না থাকলে আমি এতো ভোট পেতাম না। আমাকে বা আমার সমর্থক কাউকে বহিস্কার করলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


