আবু হানিফ চৌধুরী, দিরাই
দিরাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, দিরাই পৌরসভার মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সম্প্রতি দায়ের হওয়া ৩ খুনের মামলার আসামী। এরা ৩ জনেই সোমবার দিরাই উপজেলা সদরের একটি সমাবেশে বক্তব্য দেবেন বলে মাইকে প্রচার করা হয়। এই প্রচারণা শুনে পুলিশ, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সমাবেশের আশপাশে অবস্থান নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এরা কেউ-ই সমাবেশে আসেননি। তবে সমাবেশ মঞ্চ থেকে গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্দেশ্যে লিখিত বক্তব্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাড. সোহেল আহমদ তালুকদার ১১ টি দাবী ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন এবং তাদের প্রস্তাবনাকে গুরুত্ব দেবার জন্যও মঞ্চ থেকে অনুরোধ জানানো হয়।
গত ১৭ জানুয়ারি দিরাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের জারলিয়া জলমহালে বন্দুক যুদ্ধের ঘটনায় ৩ জন নিহত হয়। পরে এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলায় ৬৮ জনকে আসামী করা হয়।
একপক্ষের মামলায় বাদী হন একরার হোসেন নামের এক যুবলীগ নেতা। এই মামলায় দিরাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার, দিরাই পৌরসভার মেয়র মো. মোশারফ
মিয়া, দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রদীপ রায়, দিরাই প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান লিটনসহ ৩৯ জনকে আসামী করা হয়।
দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধনঞ্জয় দাস বাদী হয়ে একরার হোসেনসহ ২৯ জনকে আসামী করা হয়।
জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের আসামী করায় দিরাই উপজেলায় গত ২২ জানুয়ারি থেকে লাগাতার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছে বিভিন্ন সংগঠন। সোমবার দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করা হয়।
সমাবেশে হাফিজুর রহমান তালুকদার, মো. মোশারফ মিয়া ও প্রদীপ রায় বক্তব্য দেবেন বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। বেলা ১১ টা থেকেই দিরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সমাবেশে মিছিল করে আসতে থাকেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং এই ২ জনপ্রতিনিধির সমর্থকরা। সমাবেশের প্রচারণা শুনে সমাবেশ স্থলের আশপাশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ এবং র্যাবও অবস্থান নেয়। বিকাল ৩ টায় সমাবেশ শুরু হলেও দলীয় এই দ্ইু জনপ্রতিনিধি এবং প্রদীপ রায় উপস্থিত হননি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আছাব উদ্দিন সর্দারের সভাপতিত্বে এবং দপ্তর সম্পাদক বিকাশ রায় ও যুব লীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মিয়ার সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন-সহ সভাপতি অ্যাড. সোহেল আহমদ ও সিরাজদৌলা তালুকদার, দিরাই প্রেসক্লাব সভাপতি হাবিবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক অভিরাম তালুকদার, ইউপি চেয়ারম্যান শিবলী আহমেদ বেগ, ইউপি চেয়ারম্যান রেজওয়ান খান, ইউপি চেয়ারম্যান শাজাহান কাজী, যুবলীগ নেতা রঞ্জন রায়, কৃষক লীগের আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম, শ্রমিক লীগের সভাপতি আবুল কাশেম, ছাত্রলীগের সভাপতি উজ্জ্বল চৌধুরী প্রমুখ।
ঘোষণা দেবার পর এই তিন নেতা সমাবেশে উপস্থিত না হওয়ার বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সিরাজদৌলা তালুকদার বলেন,‘উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও প্রদীপ রায় যথা সময়ে সমাবেশস্থলে আসতে না পারায়, আমরা অন্যরা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছি, কেন তারা আসতে পারলেন না এই বিষয়টি জানতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি’।
সমাবেশে লিখিত বক্তব্যে অ্যাড. সোহেল আহমদ ১১ টি দাবী ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। এগুলো হচ্ছে- জারলিয়া নদী জলমহালে ঐ দিন সংঘর্ষে নিহতরা কেন এসেছিল এবং এরা কোন পক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছে, এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ঐ ঘটনার সময় হাফিজুর রহমান তালুকদার, মোশারফ মিয়া তাদের অফিসে সভা করছিলেন, প্রদীপ রায় ছিলেন সংসদ ভবনে, তারা কীভাবে আসামী হলেন তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন অনুসন্ধান না করেই মামলা নিয়েছে। এ কারণে থানার ওসির উপর এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। জলমহালটি দক্ষিণ নাগেরগাঁও মৎস্যজীবী সমিতির নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হলেও তাঁদের কাউকে আসামী বা স্বাক্ষী কোনটাই করা হয়নি। লোকমুখে শোনা গেছে একরার বাহিনী ভাড়াটিয়া খুনীদের দিয়ে জলমহাল দখলের জন্য ঘটনাটি ঘটিয়ে কুচক্রি মহলের ঈশারায় জনপ্রতিনিধি, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিককে আসামী করেছে। একরারের এক ভাই কামিল জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত, আরেক ভাই বদরুল আজাদ রানা সিলেটে ছাত্রদলের অস্ত্রধারী ক্যাডার। ঘটনার সময় সে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে সিলেট থেকে এসেছিল বলে লোক মুখে শোনা যায়। জলমহালের বন্দোবস্তপ্রাপ্ত সমিতির কাউকে আসামী করা হয়নি। অথচ, বিভিন্ন গ্রামের নিরপরাধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আসামী করা হয়েছে। ঘটনার পর পরই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। তিনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করার বিষয়ে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে একরার বাহিনীকে দিরাই থেকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে বলে লোকমুখে শোনা যায়, এটিও তদন্ত হোক’।


