আবু হানিফ চৌধুরী, দিরাই
দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় একের পর এক বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের বোরো ফসল। একমাত্র বোরো ফসল হারানোর ব্যথায় কৃষকের কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। ভারী বর্ষণের ফলে বৃষ্টির পানিতে জলমগ্ন হয়ে তলিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি হাওরের বোরো ফসল।
লাগাতার ভারী বর্ষণের ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে নদ নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী সবকটি বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বরাম হাওরের তুফানখালী ও কডাইকালী বাঁধের পর শনিবার রাত থেকে বৈশাখী উত্তর বাঁধ ভেঙ্গে চাপতির হাওরের ৫০০ হেক্টর বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। শুক্রবার থেকে কাদিরপুর তুফানকালী বাঁধ ভেঙ্গে শনিবার পর্যন্ত পানি ঢুকে ভরাম হাওরের প্রায় ৫ হাজার হেক্টরের মধ্যে অধিকাংশ ফসল তলিয়ে গেছে। এদিকে ঘাগটিয়া বাঁধ ভেঙ্গে টাংনি হাওরে পানি ঢুকছে। নিরুপায় কৃষকরা বাঁধ রক্ষায় এখনো স্বেচ্ছাশ্রমে প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাঁধ এলাকায় পাউবো ও পিআইসির কোন লোককে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুজ্জামান পাবেল, পৌর মেয়র মোশাররফ মিয়া ও সাবেক পৌর মেয়র আজিজুর রহমান বুলবুলসহ এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে বাঁধ রক্ষার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এছাড়া নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এবং বাঁধের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় নদীর তীর উপছে টাংনি, বরাম, কালিয়াকোটা, শাল্লার ছায়ার হাওরসহ ২৭টি হাওরে পাহাড়ী ঢলের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতিটি গ্রামের মসজিদে মাইকিং করে গ্রামবাসীকে বাঁধ রক্ষার কাজে যোগদান করতে আহবান জানালে শত শত লোকজন বাঁধ এলাকায় অবস্থান করে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
শনিবার সকাল থেকেই চাতল হতে কলিয়ারকাপন পর্যন্ত বাঁধে গ্রামের শত শত লোক মাটি কাটার কাজ করে বাঁধ রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বাঁধের উপর নির্ভর করছে চাপতির হাওরের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমির বোর ফসলের ভাগ্য।
বাঁধের কাজে নিয়োজিত কৃষকরা জানান, ভারী বৃষ্টির ফলে বাঁধ রক্ষায় পর্যাপ্ত মাটি পাওয়া যাচ্ছে না, যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তা বালি মাটি হওয়ায় কোন কাজে আসছে না। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে কোন চেষ্টাই হাওরকে পানির হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।
স্থানীয়রা জানান, ভারী বর্ষণ ও নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২৭টি হাওরে শত কোটি টাকার বোরো ফসল তলিয়ে যেতে পারে। এদিকে হাওরে ডোবরা লেগে (জলাবদ্ধতার সৃষ্টি) অন্তত এক হাজার হেক্টর বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।
কৃষির সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, পাহাড়ী ঢলের আগাম সংকেত থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো’র কর্মকর্তা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যরা তা আমলে না নিয়ে শুরু থেকে বাঁধ নির্মাণের কাজে গড়িমসি করে আসছিল। পাহাড়ী ঢলে পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়ে যখন একের পর এক বাঁধ ভেঙ্গে হাওরে পানি ঢুকছে তখন তারা বাঁধের কাজের গাফলতি ও দুর্নীতি আড়াল করতে একে অপরকে দোষারোপ করছে। পাউবোর বাঁধ বাণিজ্যের কারণেই প্রতিবছর অকালে ফসল হানির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান তালুকদার জানান, উপজেলা পরিষদ থেকে বাঁশ ও বস্তা নিয়ে ইউএনও, মেয়রসহ এলাকাবাসীকে নিয়ে শেষ চেষ্টা চাালিয়ে যাচ্ছি। পিআইসি’র সভাপতি ইউপি সদস্য লাল মিয়াকে ফোন করেও আনা যায় নি। ইউপি চেয়ারম্যান ও পাউবো’র কোন লোককে দেখতে পাওয়া যায় নি। পিআইসির কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারের কাজ ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দিরাই-শাল্লায় অধিকাংশ কাজই হয়নি।
হাওর পাড়ের কৃষকরা জানান, ভরাম হাওর উপ প্রকল্পের তুফানখালী বাঁধে ১৪ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সংশ্লিষ্ট পিআইসির সভাপতি ইউপি সদস্য লাল মিয়া ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রকল্পটি সাবলীজ দিয়ে দেয়। একইভাবে অন্যান্য পিআইসিরা বাঁধ নির্মাণ কাজের নামে বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।


