দিরাই শাল্লায় দীর্ঘকালের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে কি?

বিশেষ প্রতিনিধি
দিরাই-শাল্লায় দীর্ঘকালের সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকবে তো? এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এই দুই উপজেলার সাধারণের মাঝেও। মানুষে মানুষে ভালবাসা, মেলবন্ধন অতীত হয়ে যাবে না তো। বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটু গান গাইতাম আমরা’ গান দরাজ কণ্ঠে গেয়ে কেবলই কী স্মৃতিচারণ করবেন শিষ্য বাউল শাহ আব্দুল তোহায়েদ, আব্দুর রহমান কিংবা রণেশ ঠাকুরেরা, এমন কথা আলোচনা হচ্ছে জনে জনে। শাল্লার নোয়াগাঁওয়ের ঘটনায় এই আলোচনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
শাল্লা সদরের শাহেদ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরিফ মোহাম্মদ দুলাল বললেন, শাল্লার মানুষ দাওয়াত আর নিমন্ত্রণকে একই শব্দ মনে করে। কীর্ত্তন কিংবা মাহ্ফিল, পূজা কিংবা ঈদকে সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখে আসছেন এই উপজেলার মানুষ। শাহ্ আব্দুল করিমসহ অসংখ্য বাউলের জন্ম ভাটির এই জনপদের মানুষ সহজ সরল। জাত-ধর্মের চিন্তা এখানকার মানুষের মাথায় একসময় ছিলই না। আমার বিদ্যালয়ের ৯০০ শিক্ষার্থীর ৭৫০ জনই হিন্দু ধর্মাবলম্বি। বিদ্যালয়ের প্রতি বছরের মিলাদ মাহ্ফিলেই হিন্দু শিক্ষার্থীরা ভলান্টিয়ার থাকে। সরস্বতী পূজায় মুসলিম শিক্ষার্থী এসে আনন্দ করে। এই কয়েকদিন আগেও উপজেলা সদরের পাশে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান প্রয়াত সোমচাঁদ দাশের শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে দেখেছি টেবিলে টেবিলে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজন আছেন। কে হিন্দু, কে মুসলিম এই চিন্তা তো কেউ করেনি। এই এলাকায় কীর্ত্তনে গিয়ে খিচুরি খেতে এখনো শত শত মানুষকে দেখা যায়। একইভাবে ওয়াজে গিয়ে শিরনি খেতে দেখা যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে। এই ঐতিহ্য ভেঙে দিতে চায় একটি পক্ষ। মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে দিতে চায় এরা। এই পক্ষকে চিহিৃত করতে হবে সকলে মিলেই।
শাল্লা কলেজের প্রভাষক বিপ্লব হোম নান্নু বললেন, নোয়াগাঁওয়ের অদূরেই বাহাড়ায় সোমেশ^রি মেলা হয় চৈত্র মাসে। চৈত্র মাসের প্রথম সোমবার হয় পুরুষদের মেলা, তৃতীয় সোমবার হয় মহিলাদের জন্য মেলা। এই মেলা উপলক্ষে এই এলাকার মেয়েরা শ^শুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে নাইওর (বেড়াতে) আসে। পুরুষ ও মহিলা- দুই মেলাতেই লাখো সমাগম হয়েছে। শত শত বছর আগে থেকেই এই মেলা হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের নারী পুরুষরাই দোকান নিয়ে বসেন, ক্রেতা হিসাবেও আসেন। কোনদিনই তো দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়নি। কেউ তো জানতে চায়নি, কে হিন্দু- কে মুসলমান। এখন একটি পক্ষ আমাদের আলাদা করে দিতে চায়। একজনের একটি ফেসবুক স্ট্যটাসকে পুঁজি করে হাজার হাজার মানুষ আক্রমণ করতে আসে সম্প্রদায় ভিত্তিক, হামলা চালায় পুরো গ্রামে, এটি দুঃখজনক।


এই কলেজ শিক্ষক জানালেন, ফাল্গুন চৈত্র মাসে এই উপজেলার কল্লি, মামুদনগর, প্রতাপপুর, আটগাঁওয়ে মেলা হয়। এইবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আটগাঁওয়ে মেলা হয়নি। একইভাবে তাদের গ্রাম মামুদনগরের দুর্গাপূজায় এখন আর যাত্রাগান হয় না নিরাপত্তার কথা ভেবে। বিপ্লব বললেন, কয়েক বছর আগেও নিরাপত্তার কথা কম চিন্তা করা হতো। এখন শাল্লার কিছু কিছু অঞ্চলে যাত্রাগান হলেও কিছু এলাকায় এটি থেমে গেছে। এই শিক্ষকের মতে শাল্লা কিংবা দিরাই উপজেলায় আওয়ামী লীগই শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, এই দলে শহীদুল ইসলাম স্বাধীনের মতো অনেকেই ঢুকে গেছে, নেতৃত্বেও আছে, এই কারণে সম্প্রদায় সংস্কৃতির ক্ষতি আরও বেশি হচ্ছে। বিপ্লব দাবি করলেন, তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন, নোয়াগাঁওয়ের ঘটনার আগে ৯৯৯’এ ফোন দিয়েও সহযোগিতা চেয়েছেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু হামলা তো হলোই। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলামিন চৌধুরী আরো আগে তৎপর হলে ভালো হতো বলেও মন্তব্য করেন বিপ্লব। বিপ্লবের মতে সম্প্রীতির বন্ধন ঠিক রাখতে শস্যের ভূত তাড়াতে হবে।
শাল্লা কলেজের উপজেলার আটগাঁওয়ের বাসিন্দা অধ্যক্ষ আব্দুশ শহীদ বললেন, উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নে দুটি বড় মেলা কয়েক’শ বছরের ঐতিহ্য ছিল। বাঙালি সংস্কৃতির অংশ এটি। এই মেলা উপলক্ষে হিন্দু-মুসলমান সকল পরিবারেই মেয়ে, বোন, ভাতিজি, ভাগ্নিকে এলাকার মানুষ নাইওর আনতেন। সঙ্গে অনেকের জামাই, পুত্রা, নাতি-নাতল আসতো। মেয়েদের বা মেয়ের দিকের নাতিকে মেলা থেকে নানা সামগ্রী কিনে দেওয়া, ভালো ভালো খাবার খাওয়ানো হয়। কয়েক’শ বছর আগের সংস্কৃতি এটি। চৈত্র মাসের প্রথম সোমবার সোমেশ^রীর মেলা, মঙ্গলবার শর্মার মেলা, বুধবার আটগাঁওয়ের মেলা হতো। শিশু কিশোররা কয়েক মাস আগে থেকে মেলার জন্য প্রস্তুতি নিতো। আমরাও ছোট বেলায় ৬ মাস আগে থেকে মেলায় কী কী কিনবো বাবা-চাচার কাছে বায়না ধরে রাখতাম। এইবার হুজুররা বসে সিদ্ধান্ত নিলেন মেলা হবে না। পরে এলাকার কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষকে ডেকে তারা বললেন, মেলায় মুসলমানরা যাওয়া ঠিক নয়, মেলা হতে দেওয়া হবে না। এরপরই আটগাঁও ও শর্মার মেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রশাসনসহ এলাকার কেউই এই নিয়ে কোন কথাই বলেননি।
শাল্লা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী বললেন, শাল্লায় হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির বন্ধন ঠিকই থাকবে। নোয়াগাঁওয়ে হামলার ঘটনায় দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়নের, সন্তোষপুর, চন্ডিপুর, ধনপুর এসব গ্রাম থেকে বেশি এসেছেন মানুষ। শাল্লার সবগুলো গ্রামের মানুষকেই আমরা শান্ত রাখতে পেরেছি। তিনি বললেন, আমাদের আরো সতর্ক থাকতে হবে। দলে মামনুল হকের সমর্থক হেফাজত মার্কা লোকজন রাখা যাবে না। উস্কানী দাতাদেরও আমরা এখন থেকে নজরে রাখতে হবে। নোয়াগাঁওয়ের ঘটনায় জড়িতদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলেই এমন ঘটনার পূনরাবৃত্তি হবে না।
দিরাই উপজেলার সরমঙ্গল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এহসান চৌধুরী বলেন, আমাদের শতবছরের ঐতিহ্য কলংকিত হয়েছে। আমরা নির্বাক, কীভাবে কী হলো বুঝতেই পারছি না। ফেরানোর চেষ্টা করেছি, পারিনি। হামলায় জড়িত বেশিরভাগ মানুষ শাল্লার কাশিপুরের ছিল বলে দাবি করেন তিনি।