টিপু সুলতান, দিরাই
দিরাই-শাল্লায় ১২ হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারের সময়সীমা ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারী। ৭৬ টি পিআইসির মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৪ কোটি টাকারও বেশী। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও কাজ হয় নি ৫০ ভাগ। অনেক পিআইসির সভাপতিরা নিজেদের খেয়ালখুশি মতো কাজ করাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্পেই টানানো হয় নি সাইনবোর্ড। এখনও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে বরাম হাওরের তোফানখাড়ি বাঁধ। অর্থভাবে শেষ করা যাচ্ছে না একই হাওরের বোয়ালিয়া বাঁধের কাজ। মাটি কাটার স্থান এখনও জলমগ্ন থাকায় শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের জোয়াইরা বাঁধের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। দিরাইয়ে বাঁধের কাজ তদারকি করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয়েছে পৃথক দু’টি কমিটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ হাওররক্ষা বাঁধের কাজে পিআইসি ও ঠিকাদাররা অহেতুক সময় ক্ষেপণ করায় হাওরগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। যে কোনো সময় বৃষ্টি শুরু হলে মাটি কাটার স্থান জলমগ্ন হয়ে পড়বে। তখন কোনোভাবেই আর বাঁধে মাটি কাটা যাবে
না। এতে আগাম বন্যার ঝূঁকির মূখে পড়তে পারে শতকোটি টাকার বোরো ফসল।
পাউবো’র এসও মাহমুদুল করিম বলেন, প্রতিটি পিআইসিকে প্রকল্পের নামসহ বরাদ্দের পরিমাণ সম্বলিত সাইনবোর্ড টানানোর জন্য বলা হলেও কেউ তা আমলে নিচ্ছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, টাংগুয়ার হাওরের জাড়লিয়া নদীর তীর ও ঘোড়ামাড়া এবং বরাম হাওরের বোয়ালিয়া ও তোফান খাড়ি বাঁধের কাজে পিআইসির সভাপতিরা তার কোনো দিকনির্দেশনা মানছেন না।
কালিগুটা, ভেড়ার ডহর ও ছায়ার হাওরের বাঁধের কাজ তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত পাউবো’র উপ-সহকারি প্রকৌশলী (এসও) ইব্রাহিম খলিল অবশ্য দাবি করছেন, তার অধীনে ৩২ টি পিআইসি রয়েছে। এসব পিআইসির অনুকূলে বাঁধের কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। প্রতিটি বাঁধে গড়ে কাজ হয়েছে ৬৫ ভাগ। শুধু মাত্র ছায়ার হাওরের শ্রীহাইল এলাকায় জোয়াইরা বাঁধের কাজ বন্ধ রয়েছে। বাঁধের উভয়পাশে পানি থাকায় শ্যালো মেশিন দিয়ে মাটি কাটার স্থান শুকানো হচ্ছে।
বরাম, ভান্ডা, টাংগুয়া ও উদগল হাওরে ৩২ পিআইসি ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার বাঁধের কাজ করছে। এসব হাওরে বাঁধের কাজ তদারকি করছেন, পাউবোর এসও মাহমুদুল করিম। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ২ কিস্তিতে ৪ থেকে ৫০ ভাগ টাকা পিআইসির অনুকূলে ছাড় দেওয়ার পরও বিল না পাবার অজুহাত দেখিয়ে কাজ আটকে রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক।
জেলা পাউবো’র প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাউবো’র দিরাই সাব-ডিভিশনের আওতায় ৯ ও জগন্নাথপুর সাব-ডিভিশনের আওতায় ৩ টি হাওরে বাঁধের কাজ হচ্ছে দিরাই ও শাল্লা উপজেলায়। এসব হাওরে বাঁধের ক্ষতিগ্রস্থ অংশ পূনরাকৃতি (রি-সেকশনিং) ও অধিকতর নীচু অংশ উচুকরনের জন্য ৭৬ পিআইসির অনুকুলে প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কাজের অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে চার কিস্তিতে ওই টাকা ছাড় দেয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বাঁধ সংস্কার কাজে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা সম্পৃক্ত থাকলেও এলাকাবাসীর মতামতকে তারা প্রাধান্য দিচ্ছেন না। তবে ইউপি চেয়ারম্যানরা দাবি করছেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে দেয়া ছাড়া বাঁধের কাজে তাদের আর আর কোনো দায়িত্ব থাকে না। বরাদ্দ বিভাজন থেকে শুরু করে কোথায় কেমন কাজ হবে তার সবটাই নিয়ন্ত্রণ করেন, পাউবো’র কর্মকর্তারা।
বরাম হাওরের বোয়ালিয়া বাঁধের পিআইসির সভাপতি তাড়ল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বলেন, এখন পর্যন্ত ২ কিস্তিতে বরাদ্দের ৪৫ ভাগ টাকা তাকে দেয়া হয়েছে। ওই টাকা থেকে কেটে রাখা হয়েছে আনুষাঙ্গিক খরচসহ ভ্যাট-আইটির অর্থ। এখন অর্থাভাবে সময়মতো বাঁধের কাজ করাতে পারছেন না তিনি। তোফানখাড়ি বাঁধের পিআইসির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, টাকার জন্যে সময়মতো বাঁধের কাজ করাতে না পারায় একদিকে পাউবো আরেকদিকে এলাকাবাসীর গালমন্দ শুনতে হচ্ছে তাকে। বাঁধের কাজে টাকার যোগান দিতে গিয়ে বাপ-দাদা’র জমি-জমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হচ্ছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত তিনি ১০ টি বাঁধ পরিদর্শন করেছেন। গতকাল রোববারও বরাম হাওরের বোয়ালিয়া এবং তোফানখাড়ি বাঁধ পরিদর্শন করে তিনি বলেন, চারদিন আগে এসব বাঁধ যে অবস্থায় ছিল এখনও সেভাবেই আছে। তিনি আরও বলেন, বাঁধের কাজ তদারকি করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। উভয় কমিটিতেই একজন করে এলজিইডির উপ-সহকারি প্রকৌশলী রয়েছেন। ৩/৪ দিনের মধ্যে তারা কাজের অগ্রগতির প্রতিবেদন দাখিল করবেন। প্রতিবেদন পাবার পর বলা যাবে হাওররক্ষা বাঁধে কি পরিমান কাজ হয়েছে।


