দুদকে সৎ দক্ষ আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ানো জরুরি

দুর্নীতি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। গত ছয় মাসে সারা দেশে প্রায় তিন শতাধিক আসামি পাকড়াও করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় শতাধিক আসামি দুদকের অগোচরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে গেছেন। অনেকে কারামুক্তি পেয়েই আত্মগোপন করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। আসামিদের জামিনের ক্ষেত্রে দুদকের কিছু আইনজীবীর উদাসীনতা ও অবহেলাকেই মূলত দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুদকে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান আইনজীবী সংকটের কথা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হচ্ছে বেশ দিন ধরেই। যে কারণে দুদক প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না, বেশিরভাগ মামলায় আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে। আর এই কারণে দুদকের মামলায় দুদকের সাফল্য তুলনামূলকভাবে কম; মামলা নিষ্পত্তির হারও কম। দুদকের কাক্সিক্ষত ভূমিকা নিশ্চিত করতে দুদকে নিজস্ব আইনজীবী প্যানেলকে শক্তিশালী করা এবং মামলার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত মাপের আইনজীবী দ্বারা মমলা পরিচালনার ব্যবস্থা করার কোনো বিকল্প নেই।
একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মার্চ মাসে দুদকে নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেয়ার পর দুদকের মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়েছে। তবে আলোচিত মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আসা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব জামিনের ঘটনায় দুদকের প্যানেলভুক্ত কিছুসংখ্যক আইনজীবীর দ্বৈত নীতি, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, অসততা এবং দুদকের সঙ্গে আইনজীবীদের সমন্বয়হীনতাই মূল কারণ বলে মনে করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। দুদকের তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। আইনজীবীদের দক্ষতা ও সততা নিয়েও জনমনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। জানা গেছে, কাজে অবহেলার দায়ে ও পারফরম্যান্স বিবেচনায় সা¤প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে প্যানেল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এ থেকেই প্রতীয়মান যে, অভিযোগ বা সংশয় অমূলক নয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এটাও ভালো দৃষ্টান্ত। জামিনের পর ব্যবস্থাগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে দুদক সংশ্লিষ্টরা বলেন, দুর্নীতি মামলায় আসামির জামিন ও কারামুক্তির বিষয়ে বিলম্বে তথ্য পাওয়ায় আইনগতভাবে দুদকের পদক্ষেপ নিতেও বিলম্ব হয়। অর্থাৎ এখানে প্রক্রিয়গত জটিলতাও রয়েছে। এগুলোর নিরসন দরকার।
আমরা মনে করি, আলোচিত মামলাগুলোর তদন্ত থেকে শুরু করে বিচারের প্রক্রিয়া কিভাবে সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তা ভেবে দেখতে হবে এবং সে ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে দুদক তার তৎপরতা দিয়ে আগের ভাবমূর্তির সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। দুর্নীতির দায়ে মামলার সংখ্যা বাড়ছে। সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতা এবং প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তারাও বাদ পড়ছেন না। কিন্তু তদন্ত, অভিযোগ গঠন, মামলা পরিচালনায় দুর্বলতা বা গাফিলতি বা অসদাচরণের কারণে যদি অভিযুক্তদের শস্তি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সেটা দুর্ভাগ্যজনক। দেখা যাচ্ছে, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, নিজস্ব দক্ষ আইনজীবীর অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বেশিরভাগ মামলায় আসামি পক্ষের কাছে হেরে যাচ্ছে দুদক। আসামিরা জামিন পেয়ে আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে, মামলা উচ্চ আদালতে গিয়ে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে দুদকের মামলার নিষ্পত্তিতে অগ্রগতিও কম। এ অবস্থার পরিবর্তনে দুদকে সৎ, যোগ্য কর্মকর্তা ও আইনজীবীর সমাবেশ ঘটাতে হবে। দুদকের নিজস্ব আইনজীবী প্যানেল শক্তিশালী করার পাশাপাশি মামলার প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত মাপের আইনজীবী দ্বারা মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক জোগান নিশ্চিত করতে হবে। দুদকের কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। দুদকের দক্ষ নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পার পাওয়ার চেষ্টা না করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।