সু.খবর ডেস্ক
পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া হাওরাঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার মতো পরিস্থিতি সেখানে তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রবিবার সচিবালয়ের নিজ দপ্তরের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন মন্ত্রী।
হাওরপারের জেলাগুলোর প্রধান ফসল বোরো ধান। কাটার উপযোগী হওয়ার আগেই পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় প্লাবিত হয়ে পচে গেছে এই ফসল। মড়ক লেগেছে মাছে। দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি বানভাসী হাওরাঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি
করে আসছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘হাওরে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার যথেষ্ট সক্ষমতা আমাদের আছে। যে সমস্যা হয়েছে, সেগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব নেই। কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যাবে না।’
হাওর এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত তিন লাখ ৩০ হাজার পরিবারকে সরকার নগদ অর্থ ও চাল সহায়তা দেবে বলে জানান মন্ত্রী। আজ থেকে ১০০ দিন এই সহায়তা দেয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাওরপারের ছয় জেলার চারটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষকে মাসে ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা নগদ দেয়া হবে। রবিবার থেকে এই সহায়তা কর্মসূচি চলবে ১০০ দিন। প্রথম কিস্তির সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে মোট ৩ হাজার ১২৪ মেট্রিক টন চাল ও ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা, যা বিতরণ করা হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে।
ত্রাণমন্ত্রী জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা সুনামগঞ্জের ৮৬ শতাংশ মানুষের ফসল নষ্ট হয়েছে। ওই এলাকার মানুষের চাহিদা ছিল তিন থেকে ছয় মাস খাদ্য দিয়ে সহায়তা করার। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমরা বলেছি, ওই এলাকার মানুষ যত দিন না স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে, বা পরবর্তী ফসল না পাবে, তত দিন সহায়তা চলবে। ছাড়া ওএমএস ও ভিজিএফের মাধ্যমে ১০ টাকা, ১৫টা চাল দেয়ার কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এর সুবিধা পাবে হাওর এলাকার সব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
জেলা অনুযায়ী চাল ও অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা তুলে ধরা হয় সংবাদ সম্মেলনে। সিলেটে ৪২৮ মেট্রিক টন চাল ও ২৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা দেয়া হবে ৫০ হাজার পরিবারকে। সুনামগঞ্জে ১০৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৭৫ লাখ টাকা পাবে ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবার। হবিগঞ্জে ২৯ হাজার পরিবারের জন্য বরাদ্দ ৩০৩ মেট্রিক টন চাল ও ১৪ লাখ টাকা। মৌলভীবাজারের জন্য বরাদ্দ ৩৪৩ মেট্রিক টন চাল ও ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যা পাবে ১ হাজার পরিবার। কিশোরগঞ্জে ৫৫২ মেট্রিক টন চাল ও ৩৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য। নেত্রকোনায় ৪৪৮ মেট্রিক টন চাল ও ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা পাবে ৫০ হাজার পরিবার।
হাওর এলাকাকে ‘দুর্গত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি জানিয়ে কি কি কারণে কোনো এলাকাকে দুর্গত হিসেবে ঘোষণা করা যায় সে বিষয়ে এ সংক্রান্ত আইনে বিস্তারিত লেখা থাকার কথা জানান মায়া। সাংবাদিকদের ওই আইনের কপিও সরবারহের নির্দেশনা দেন তিনি।
হাওরের পানিতে পিএইচের স্বাভাবিক মাত্র ৬ দশমিক ৫ থেকে ৯ জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব মাকসুদুল হাসান খান সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, গত ১৬ থেকে ১৮ এপ্রিল পিএইচ-এর মাত্রা ছিল ৫ বা তার নিচে। অক্সিজেনের মাত্রা ছিল দশমিক ০২, অ্যামোনিয়ার মাত্রা ছিল দশমিক ০২ এর নিচে।
“যার ফলে প্রাথমিক গবেষণার যে ফল দেখা যায়- মূলত ফসল পঁচে গেছে, তাছাড়া কিছু কীটনাশক থাকতে পারে যার ফলে মাছ মারা যায়, এছাড়া আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।”
হাওর অঞ্চলে বন্যায় ১ হাজার ২৭৬ মেট্রিক টন মাছের ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে মাকসুদুল বলেন, ৩ হাজার ৮৪৪টি হাঁস মারা গেছে।
কৃষি সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্ বলেন, “পাহাড়ি ঢল প্রতিবছরই মোকাবেলা করতে হয়, এবার এটা তিন সপ্তাহ আগে মোকাবেলা করতে হয়েছে। ফলে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে গেছে।
“প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা নিমজ্জিত হচ্ছে আবার কোনো কোনো এলাকায় ৪-৫ দিন পরে পানি সরে যাচ্ছে। দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতি হয়েছে, চালে ৬ লাখ মেট্রিক টন হবে।”
হাওরের ফসলের ক্ষতিতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই বলে আশ্বস্ত করে কৃষি সচিব বলেন, “অন্যত্র ভালো ধান হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে, আউশ ও আমনে প্রণোদনা বাড়িয়ে দেব।”
পানি সম্পদ সচিব জাফর আহমেদ খান বলেন, “আমাদের বাঁধগুলো ষাটের দশকে করা হয়েছিল। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে, ক্লাইমেট চেইঞ্জের কারণে উজানের ঢল, বন্যা এসব প্রেক্ষিতে নতুন করে ভাবব।
“আরও এক মিটার উচু করা প্রয়োজন কি না- প্রয়োজনের বাইরে করলেও কিন্তু অসুবিধা হবে। সান্টিফিক্যালি অবস্থা দেখে কি করণীয় সেভাবে ব্যবস্থা নেব।”
সময়মতো বাঁধ মেরামত করতে উপজেলাভিত্তিক কাজ করা হবে জানিয়ে জাফর আহমেদ বলেন, “আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু দেখভাল ও বিল পরিশোধ করবে। মূল কাজগুলো স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করব।”
সমস্যা চিহ্নিত করতে কমিটি গঠন
ত্রাণমন্ত্রী জানান, হওয়ার এলাকার মানুষের সমস্যা ও সমাধান খুঁজতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব। আর সব মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হলেন কমিটির সদস্য। এই কমিটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হাওর এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেবে।
খালেদাকে প্রতিনিধি পাঠাতে অনুরোধ
কোনো রাজনৈতিক দল এখনো হাওরের মানুষকে দেখতে যায়নি বলে অভিযোগ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘তারা শুধু মুখে মুখে কথা বলে বেড়াচ্ছেন। আমি সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান জানাব তারা যেন হাওরের বানবাসী মানুষের পাশে দাঁড়ান।’
বিএনপির চেয়ারপারসনের উদ্দেশে মায়া বরেন, ‘বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে বলব, আপনি তো অসুস্থ, হাওরে যেতে পারবেন না। তবে আপনার দলের অনেক মোটাসোটা লোক আছে, তাদের পাঠান। মানুষের কষ্ট দেখে আসুক। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। শুধু মুখে কথা বললে হবে না।’
বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চান মায়া
বানবাসী মানুষ নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়ে ত্রাণমন্ত্রী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, এমন সংবাদ প্রচার করবেন না যাতে হওরের মানুষ আতঙ্কিত হয়।’
এসময় খাদ্য সচিব, অর্থ সচিব, ত্রাণ সচিব ছাড়াও স্থানীয় সরকার বিভাগ, তথ্য ও অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রধান প্রকৌশলীরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
- এই পানি কোনো বাঁধ আটকাতে পারতো না -পানিসম্পদমন্ত্রী
- হাওরের পানিতে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়নি -ড. দিলীপ কুমার সাহা


