দুর্গত ঘোষণাসহ ১২ দফা দাবি উত্থাপন

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে দিনব্যাপী আঞ্চলিক হাওর কনভেনশন করেছে বাসদ (মার্কসবাদী) সিলেট অঞ্চল। সুনামগঞ্জসহ ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণাসহ ১২ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয় কনভেনশন থেকে। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১ টায় শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে এই কনভেনশন শুরু হয়।
সিলেট জেলা বাসদ’এর আহ্বায়ক উজ্জ্বল রায়ের সভাপতিত্বে কনভেনশনে বক্তব্য রাখেন- বাসদ’এর কেন্দ্রীয় কার্য পরিচালনা কমিটির সদস্য কমরেড শুভ্রাংশ চক্রবর্তী, জল ও পরিবেশ গবেষণা ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, জেলা জাসদ’র সভাপতি আতম সালেহ্, জেলা উদীচী’র সভাপতি শীলা রায়, জেলা সিপিবি’র সভাপতি চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, লেখক সুখেন্দু সেন, জাতীয় আইনজীবী সমিতি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি অ্যাড. রুহুল তুহিন, সাংবাদিক পঙ্কজ দে প্রমুখ।
বক্তারা বলেন- হাওরে জনবসতি গড়ে ওঠার পর থেকে প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে এখানকার মানুষ কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। দেশের মোট ধানের প্রায় ১৮ ভাগ এখনো হাওর থেকে আসে। প্রাকৃতিক মৎস্যক্ষেত্র থেকে আসা মাছের মধ্যে হাওরের অবদান সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৩৬ ভাগ মাছ হাওর থেকেই উৎপাদন হয়। পরিযায়ী পাখিদের সবচেয়ে বড় বিচরণ ক্ষেত্র এই হাওর। এ বছর দেশের ৪৫ টি জেলায় ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো মৌসুমে ধান চাষ করা হয়েছিল। এরমধ্যে হাওরাঞ্চলে বোরো আবাদ হয়েছিল ৯ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ দেশের বোরো ধান চাষের ৫ ভাগের একভাগ এলাকা হাওরাঞ্চলে। হাওরে শুধু ধান নয়, মাছ, হাঁস গবাদিপশুর বড় ভান্ডার। হাওর নিয়ে কাজ করা ৩৫ টি আন্তর্জাতিক- দেশীয় সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত হাওর অ্যাডভোকেসি প¬াটফর্ম সরকারের কাছ থেকে নেওয়া তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলেছে, হাওরাঞ্চলে এবার ধানে মোট ক্ষতি হয়েছে ৪ হাজার ৩৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সুনামগঞ্জেই কেবল এক হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এছাড়া সিলেটে ৪৫০ কোটি, হবিগঞ্জে ৬৬১ কোটি, নেত্রকোনায় ৪৬৩ কোটি, মৌলভীবাজারে   ২৪৬ কোটি, কিশোরগঞ্জে ৬০০ কোটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। কাঁচা ধান পঁচে পানিতে অক্সিজেন একেবারে কমে অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ৪১ কোটি টাকার মাছ ও ৩ হাজার ৮৪৪ টি হাঁস মরেছে। গৃহপালিত পশুর খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ায় কৃষকরা পানির দামে গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন।’
বক্তারা আরো বলেন,‘আবহাওয়া অধিদপ্তর ইতিপূর্বে জানিয়েছে, এ বছরের মতো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ৩৫ বছর আগে ১৯৮১ সালে একবার হয়েছিল, তখনও হাওরের সিংহভাগ ফসল তলিয়ে যায়নি। নদীর নাব্যতা থাকায় তখন হাওর রক্ষা হয়েছে। গত ৩৫ বছরে হাওরে অপরিকল্পিত উন্নয়নে হাওরের গভীরতা ভরাট হয়েছে।’
কনভেনশনে বলা হয়, ‘হাওর জনপদের জনগণ কৃষি, মৎস্যসহ হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের স্থায়িত্বশীল ব্যবহারের ভেতর দিয়েই এককালে গড়ে তুলছিলেন স্বনির্ভর হাওর জীবন। হাওর জনপদের মানুষের সেই সার্বভৌমত্বের হাওর জীবন আজ বিপন্ন ও বিলীন। ৭ জেলার ৯০ ভাগ মানুষ আজ নিঃস্ব, অসহায় বোধ করছেন মনুষ্যসৃষ্ট এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে। এই অবস্থায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক অর্থাৎ সামগ্রিক বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে- কনভেনশন থেকে ১২ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। সেগুলো হচ্ছে- সুনামগঞ্জসহ ক্ষতিগ্রস্ত হাওর অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হবে। সরকারি কৃষি ঋণ মওকুফ, এনজিও ঋণ, মহাজনী ঋণ আদায় ২ বছরের জন্য স্থগিত, সকল সুদ মওকুফ। বিনা সুদে, বিনা শর্তে কৃষি ঋণ প্রদান, শস্য বীমা চালু, বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ প্রদান। জলমহালের ইজারা প্রথা বাতিল, সকল জেলে কৃষকদের অবাধে মাছ ধরার অধিকার প্রদান ও প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রকাশ, সারা বছর রেশনিং চালু ও ত্রাণ নিয়ে দুর্র্নীতি বন্ধ করতে হবে। গবাদি পশুর খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সকল স্তরে ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি, মাসিক বেতন মওকুফ, সারাবছর বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র চালু ও বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করতে হবে। দ্রুত নদী খননের ব্যবস্থা এবং সংকুচিত নৌ-পথ সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রকৃতি নির্ভরতা কাটানোর লক্ষ্যে হাওর গবেষণা ইনস্টিটিউট চালু করতে হবে। দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তা, ঠিকাদারদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।