বিশেষ প্রতিনিধি ও সাইদুর রহমান আসাদ
‘পঁচা গন্ধ, চাইরবায়দি ময়লা ভাসের, পানি লাগলেই কাউজানি, কিযাত কষ্ট কওয়ার মতো নায়, এরপরেও তো বারনি লাগের, অখন শহরের ভিতরের রাস্তাঘাটে ব্লিচিং পাউডার চিটানি দরকার।’
শহরের পশ্চিম হাজীপাড়ার শিল্পী বেগম বাড়ির সামনের সড়কে ঘণ্টা সমান পানি পার হয়ে শহরের দিকে যাবার সময় এভাবেই পানি কমে যাবার পরের কষ্টের কথা জানাচ্ছিলেন।
কেবল পশ্চিম হাজীপাড়া নয় সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগর, পূর্ব—পশ্চিম নতুনপাড়া, কালীপুর, হাছনবসত, সুলতানপুর, শান্তিবাগ এলাকায় পঁচা ও জমাট বাঁধা পানি ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ কারণে পানিবাহিত রোগ বালাই বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টানা ১৫ দিন ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার সিংহভাগ এলাকা ডুবেছিল। চারদিনের রোদে পরিস্থিতি বদলেছে, তবে বন্যা পরবর্তী দুর্ভোগ ঘরে ঘরে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মধ্য শহর থেকে বর্ধিত এলাকায় ঘণ্টা থেকে কোমর সমান পানি ছিল। ঢলের পানি ঘরবাড়ি থেকে নেমেছে। তবে কাঁচা ঘরবাড়ি’র বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। একইসঙ্গে পঁচা দুর্গন্ধযুক্ত আটকে থাকা পানির কষ্ট এলাকায় এলাকায়।
গত চারদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় স্বস্তি ফিরলেও পানিবাহিত রোগের আতঙ্ক আছে অনেক এলাকায়।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের মোবারক আলী বললেন, পঁচা ধানের গন্ধ পানিতে— বাতাসে। রোদে কেউ কেউ পঁচা নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন।
সুনামগঞ্জ শহরতলির কালীপুর এলাকার দেওয়ান আলী বললেন, পলিথিনে ভাসছে ময়লার প্যাকেট। শহরের বিভিন্ন এলাকার ময়লা পলিথিনের প্যাকেট ঢেউয়ে কালীপুর—হাছনবসত এলাকার বাড়িঘরের উঠোনে, সড়কে নিয়ে আসছে। ঘরে ঘরে জ¦র—ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। পানিবাহিত রোগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।
একই এলাকার বাসিন্দা আকলিমা বেগম বললেন, ক্ষেতের ড্যাংগা পঁচে ও ঢলের সঙ্গে ময়লা আবর্জনা এসে পানি নষ্ট হয়ে গেছে। পানি যতই কমছে ততই দুর্গন্ধ বাড়ছে। এই পানিতে গোসল করলে চুলকায়, এলার্জির মতো গুটা বের হয়। গোসল না করেও উপায় নেই।
পূর্ব সুলতান পুরের বাসিন্দা আইতুন নেছা বললেন, পানিতে গন্ধ করে, পচে গেছে। এই পানিতে গোসল করলে শরীর চুলকায়।
পশ্চিম হাজি পাড়ার বাসিন্দা সাজেদা খাতুনে বসতঘরে একসপ্তাহ পানি ছিল। তার শিশুপুত্র জ¦রে আক্রান্ত হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে হাসপাতালে আছেন।
হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে থাকা শান্তিগঞ্জের আপ্তারপাড়া গ্রামের আকবর আলী বললেন, ‘ঘরে পানি ওঠেছে, পানি নামার দুদিন পরেই নাতির পেটে অসুখ হয়েছে, তাকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।
জেলার দোয়ারাবাজার হাসপাতালের উপ—সহকারী মেডিকেল অফিসার ডা. হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বুধবার হাসপাতালের আউটডোরে অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বেশি ছিল।
দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া টিউবওয়েল বিশুদ্ধকরণ না করেই পান করছেন অনেকে।
সুনামগঞ্জ জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কাসেম বললেন, সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারা ও ছাতকের সহ¯্রাধিক টিউবওয়েল ডুবেছিল। যেগুলোতে পানি ওঠতে সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেগুলো মেরামত করে পানি বিশুদ্ধকরণ করে ব্যবহার উপযোগী করে দেবার কাজ করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মীরা। যে টিউবওয়েলগুলো বিকল হয় নি, সেগুলো থেকে পানি সরার সঙ্গে সঙ্গে এক বালতি পানির মধ্যে ২০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে পাঁচ—সাত মিনিট চাপ দিয়ে পানি বের করে ফেলে দিলেই টিউবওয়েলটির পানি বিশুদ্ধকরণ হয়ে যাবে। লেয়ারের পানি কখনোই দুষিত হয় না, পাইপের পানি পরিস্কার করে টিউবওয়েলের পানি খেতে বাধা নেই।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বুধবার পেটের অসুখ নিয়ে ৪১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আহম্মদ হোসেন বললেন, বন্যার পানি কমলেও পানিবাহিত রোগের সংখ্যা বাড়তে পারে, হতে পারে গ্যাংরিং সহ মারাত্মক রোগ। এখনও অনেক জায়গায় বন্যার পানি আটকে রয়েছে। যে টিউবওয়েলগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়েছিলো সেখান থেকে পানি খাওয়া যাবে না, টিউবওয়েলের পানি জীবাণুযুক্ত থাকতে পারে। যারা গোসলের জন্য পানি ব্যবহার করবেন, তারা যেনো ফিটকিরি দিয়ে ব্যবহার করে। খাবার পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে উপজেলা হাসপাতাল, ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিকে বিশুদ্ধকরণের ট্যাবলেট সরবরাহ করা হয়েছে।
এদিকে বন্যার পানি কমলে নাগরিকদের পরবর্তী সমস্যায় করণীয় ঠিক করতে সভা করেছে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। সেখানে বন্যার পানিতে জমে থাকা ময়লা আবর্জনা দ্রুত পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত বললেন, বন্যা পরবর্তী নানা রোগ বালাই দেখা দিতে পারে। ঢলের সঙ্গে আসা ময়লা আবর্জনা ভাসছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই পঁচে দুগন্ধ ছড়াচ্ছে। কাউন্সিলরদের সভা করা হয়েছে। ময়লা আবর্জনা দ্রুত সরানোর কাজ শুরু হবে। যেখানে ব্লিচিং পাউডার ছিটানো প্রয়োজন, সেখানে সেটিও করা হবে।
- বন্যায় ধান, মাছ, সড়কের শতকোটি টাকার ক্ষতি
- ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের নির্দেশ


