বিশেষ প্রতিনিধি
চৈত্র মাসে অর্থাৎ ধানের চারায় দানা আসার আগেই জেলার প্রায় সব কয়টি হাওর ডুবে যাওয়ায় উৎকণ্ঠিত সুনামগঞ্জের ২৫ লাখ মানুষ। এমন দুর্যোগেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জেলাজুড়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসন চালের দাম স্বাভাবিক রাখতে বুধবারও সুনামগঞ্জ শহরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। এসময় অতিরিক্ত দামে চাল বিক্রি করায় ৫ জন চাল ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলার জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে মোবাইল কোর্ট একজন চাল ব্যবসায়ীকে অতিরিক্ত দামে চাল বিক্রি করায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় অসৎ চাল ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দামে চাল বিক্রি করছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি বোরহান উদ্দিন দোলন বলেন,‘দক্ষিণ সুনামগঞ্জে অসৎ মিলারদের যোগসাজসে কিছু চাল ব্যবসায়ী চালের মূল্য বস্তা প্রতি ৪-৫’শ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করা শুরু করেছেন, কেউ কেউ কেউ ২২’শ টাকার চালের বস্তা গত দু’দিন ২৮০০ টাকায়ও বিক্রি করেছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানোর পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিনে বাজার মনিটরিংয়ে নেমেছেন। কোথাও কোথাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিজেই কৃষকদের কাছে চাল বিক্রি করেছেন।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন,‘বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যারা চাল-আটার মূল্য বাড়িয়েছে তাদেরকে সতর্ক করে দেবার জন্য বাজারে বাজারে ঘুরছি আমরা। বাজারে
সরেজমিনে ঘুরার সময় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায় উপজেলার শান্তিগঞ্জ বাজারের জয়গুরু ভা-ার ও দেলোয়ার ভেরাইটিজ স্টোর, নোয়াখালি বাজারের আলম স্টোরের মালিক তহুর আলী বেশি দামে চাল-আটা বিক্রি করছেন। আমরা ঐ দোকানগুলোতে গিয়ে চালের দাম জানতে চাইলে তারা কমিয়ে বলেন, অর্থাৎ ২১৫০ টাকা বা ২২০০ টাকা। আমি সঙ্গে সঙ্গে ঐ দামে চাল বিক্রি করতে চাইলে কেউ ( কোন কৃষক) চাল কিনবেন কী-না জিজ্ঞেস করি। খবর পেয়ে বাজারে আসা কৃষকসহ কয়েকজন চালের ক্রেতা এই দামে চাল কিনতে চাইলে আমি দাঁড়িয়ে থেকে চাল বিক্রি করার ব্যবস্থা করি।’
সুনামগঞ্জের চালের বাজার এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাটবাজার গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,‘বস্তা প্রতি চালের দাম ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা, গমের দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
শহরের চাঁদনিঘাটের রান্নাঘর রেস্টুরেন্টের মালিক আমির হোসেন বলেন, ‘৪-৫ দিন আগেও চিকন সিদ্ধ চাউল ২২০০ টাকা বস্তা আনতাম, এখন ২৮০০ টাকায় আনরাম, এক বস্তা চাউলে ৬০০ টাকা দাম বাড়ছে’। সদর উপজেলার কামারগাঁওয়ের রিক্সাচালক মানিক মিয়া বলেন, ‘আমি রিক্সা চালিয়ে দিন আনি দিন খাই, চাউল কিনলে এখন আমরার সব টাকা চলে যায়, সোমবারে চাউল কিনছি ৪২ টাকা কেজি। আইজ বাজারও চাউল কিনতে এসে দেখি ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে’।
হাছন বাহারের শাহিন আহমদ বলেন, ‘আমার হোটেলের জন্য কয়েক দিন আগে ১৭৫০ টাকায় যে চাউলের বস্তা কিনছিলাম, আজকে সেই চাউলের বস্তা ২২০০ টাকা দিয়ে আনছি’।
বুধবার বিকাল ৪ টা ১০ মিনিটে তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি বাজারের এনামুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া স্টেটাসে বলেছেন,‘৫০ টাকা কেজি’র নিচে কোন চালই তাদের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।’
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খুচরা চাল বিক্রেতা সুলতান মিয়া বলেন, ‘আমাদের উপজেলার কোন মিলে চাল নেই, আমি সুনামগঞ্জে এসেছি চাল কেনার জন্য। কিন্তু দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। পাইকারি দরে ৫০ কেজি বস্তার গুটি স্বর্ণা চাল ক্রয় করেছি ২১’শ টাকায় ও সিদ্ধ চাল ক্রয় করেছি ২২’শ টাকায়’।
সুনামগঞ্জ শহরের রাসেল অটো রাইস মিলের মালিক রাসেল আহমদ বলেন, ‘আমাদের মিলে কোন ধান নেই। বৈশাখ মাসে ধান পাওয়া যাবে এবং পুরাতন ধান থাকলে কম দামে বিক্রি করা লাগবে, এই আশংকায় সব ধান চাল করে বিক্রি করা হয়েছে। মিল মালিকরা কোন সি-িকেট করছে না’।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চালের দাম যাতে বৃদ্ধি না পায় সে জন্য আমরা মিল মালিকদের সাথে বৈঠক করেছি। চালের দাম যাতে কোন দোকান মালিক বেশি রাখতে না পারে সে জন্য মোবাইল কোর্ট করা হচ্ছে। চালের কৃত্রিম সংকট যাতে না হয়, সে জন্য অন্য জেলা থেকে চাল আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, প্রত্যেক উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা বাজার মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। মাইকে সকলকে সতর্ক করে বলা হচ্ছে, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।


