বিশেষ প্রতিনিধি
পবিত্র ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে দুস্থ ও অতিদরিদ্রের জন্য সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলায় প্রায় ছয় কোটি ৬০ লাখ টাকার চাল বিতরণ করবে সরকার। শুক্রবার থেকে এই চাল বিতরণ শুরু হয়েছে। গরিবের এই চালেও ধনীর ভাগ নেবার চেষ্টা আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে অনেক ইউনিয়নে। দোয়ারাবাজারের নরসিংহপুর ইউনিয়নে দুস্থের চাল আত্মসাতের চেষ্টা ঠেকিয়েছেন উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান। শুক্র ও শনিবার এ নিয়ে আলোচনা ছিল দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরে।
উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানালেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের দুই ইউপি সদস্য ফোন দিয়ে জানালেন, তাদের ইউনিয়নে ৯০০ বস্তা চাল এসেছে। তারা জানতে চেয়েছেন কত টন চাল দেওয়া হয়েছে এই ইউনিয়নে। আমি সঙ্গে সঙ্গে কাগজ দেখে তাদেরকে জানিয়ে দিলাম নরসিংহপুর ইউনিয়নে বরাদ্দ সাড়ে দশ টন চাল। তারা হিসাব করে জানালেন, চাল দেড় টন কম গেছে ইউনিয়নের গোদামে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাত সাড়ে ১২ টায় ওই ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ সচিবকে ফোন দেই, চাল কত টন রিসিভ করেছেন। উত্তরে তিনি বললেন, চাল চেয়ারম্যান সাহেব রিসিভ করেছেন, তিনি এই বিষয়ে জানেন না।
তিনি জানান, পরদিন (শুক্রবার) সকাল নয়টায় গোদাম কর্মকর্তাকে ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছিলেন নরসিংহপুর ইউনিয়নের বরাদ্দের দেড়টন চাল গেল কোথায়, ওখানে আজ শুক্রবার চাল বিলি হবে, অথচ এখনো দেড়টন চাল যায় নি। ১০ মিনিট পরে তিনি ফোন দিয়ে জানালেন, চেয়ারম্যান সাহেব (নরসিংহপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান) ৫০ বস্তা চাল গোদামে রেখে গেছেন। আজ নিয়ে যাবেন। শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও বিষয়টি জানানো হয়। একপর্যায়ে শুক্রবার সকাল ১০ টায় আরেক পিকআপে করে চাল পাঠানো হয় নরসিংহপুর ইউনিয়নে।
ভাইস চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানালেন, গেল ঈদের আগেও এই ইউনিয়নে কালো বাজারে বিক্রয় করা ৬৫ বস্তা ভিজিএফ’র চাল আটক করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে দুস্থদের মধ্যে বিলি করা হয়েছিল।
নরসিংহপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূর উদ্দিন আহমদ অভিযোগের জবাবে বললেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানসহ আমার ইউনিয়নের তিনজন সদস্য এই মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়েছেন, ভিজিএফ’র চাল আমার এখানে তিনটি পিকআপে বৃহস্পতিবার ৯০০ বস্তা এসেছে। যাদেরকে পরিবহনের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারাই ভাড়া বেশি নেবার জন্য দুই দিনে চার পিকআপে চাল এনেছে। বৃহস্পতিবার তিন এবং শুক্রবার এক পিকআপে চাল এনেছে। পরে ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে ৩০ কেজির বস্তা তিনজন-তিনজন করে বিতরণ করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ মুর্শেদ মিশু বললেন, বৃহস্পতিবার রাত দুইটায় খবর পাই নরসিংহপুর ইউনিয়নে ভিজিএফ’র দেড়টন চাল নেওয়া হয় নি। পরে শুক্রবার সকালে চাল ওখানে গেছে এবং ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে চাল বিলি হয়েছে। এর আগের ঈদে একই ইউনিয়নে ৬৫ বস্তা চাল বাজার থেকে উদ্ধার করে আমি নিজেই দুস্থদের মধ্যে বিলি করেছিলাম। পরবর্তীতে এই বিষয়ে তদন্ত হয়। তদন্ত কমিটির দায়িত্বশীলরা রিপোর্ট দেন, উপকারভোগীরাই এই চাল বিক্রয় করেছিলেন। এজন্য কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় নি।
শান্তিগঞ্জের একজন সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (নাম জানাতে চান নি) জানালেন, দ্স্থুদের চাল কোন কোন ইউনিয়নে নির্ধারিত উপকারভোগীরা ১০ কেজির স্থলে কেজি দেড় কেজি কম পান। বিতরণের সময় হঠাৎ গিয়ে ওজন দিলেই সেটি ধরা পড়বে।
সুনামগঞ্জে এবার ঈদ উপলক্ষে এক লাখ ৫১ হাজার ১৬৭ জনের মধ্যে সরকারের দেওয়া ১৫১১ টন ৬৭ কেজি চাল দুস্থদের মধ্যে বিলি করা হচ্ছে। এসব চাল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে উপজেলা উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এরমধ্যে তাহিরপুর উপজেলার সাত ইউনিয়নের ১৩ হাজার ৫২৪ জন ভিজিএফ কার্ডধারীকে ১৩৫ টন ২৪০ কেজি, শান্তিগঞ্জের আট ইউনিয়নে আট হাজার ৯১০ জন কার্ডধারীর মধ্যে ৮৯ টন ১০০ কেজি, জগন্নাথপুরের আট ইউনিয়নে ১১ হাজার ৮৬১ জনের জন্য ১১৮ টন ৬১০ কেজি, বিশ^ম্ভরপুরের পাঁচ ইউনিয়নের ছয় হাজার ৪২৬ জনের মধ্যে ৬৪ টন ২৬০ কেজি, সুনামগঞ্জ সদরের আট ইউনিয়নের ১০ হাজার ২০০ জনের জন্য ১০২ টন, ধর্মপাশা-মধ্যনগরের ১০ ইউনিয়নের নয় হাজার ৪৩৭ জনের জন্য ৯৪ টন ৩৭০ কেজি, দিরাইয়ের নয় ইউনিয়নের ১৯ হাজার ৩১২ জনের জন্য ১৯৩ টন ১২০ কেজি, শাল্লার চার ইউনিয়নের ২৩ হাজার ৩১৫ জনের জন্য ২৩৩ টন ১৫০ কেজি, ছাতকের ১৩ ইউনিয়নের ১৩ হাজার ৫৬০ জনের জন্য ১৩৫ টন ৬০০ কেজি, দোয়ারাবাজারের নয় ইউনিয়নের আট হাজার ৪৬৬ জনের জন্য ৮৪ টন ৬৬০ কেজি এবং জামালগঞ্জের ছয় ইউনিয়নের ১০ হাজার ৭৫২ জনের জন্য ১০৭ টন ৫২০ কেজি চাল বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সুনামগঞ্জ পৌরসভার চার হাজার ছয়শ ২১ জনের জন্য ৪৬ টন ২২০ কেজি, ছাতক পৌরসভার চার হাজার ৬২১ জনের জন্য ৪৬ টন ২১০ কেজি, জগন্নাথপুর পৌরসভার তিন হাজার ৮১ জনের জন্য ৩০ টন ৮১০ কেজি এবং দিরাই পৌরসভার তিন হাজার ৮১ জনের জন্য ৩০ টন ৮১০ কেজি চাল ইতিমধ্যে ঈদ-উল- আযহা উপলক্ষে দুস্থদের মধ্যে বিতরণের জন্য দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিতরণও শুরু হয়েছে চাল।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বললেন, ঈদ-উল- আযহা উপলক্ষে দুঃস্থ ও অতিদরিদ্রের মধ্যে ভিজিএফ’এর চাল বিতরণে অনিয়মের কোন লিখিত অভিযোগ এখনো পাওয়া যায় নি।


