দেশীয় মাছের বংশ রক্ষায় উদ্যোগী হোন

ক্রমাগত দেশীয় জাতের মাছের বিলুপ্তি ঘটছে। একই সাথে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। যে হাওরাঞ্চল অসংখ্য বিল ও জলাশয় দ্বারা বেষ্টিত থাকার কারণে দেশীয় জাতের মাছের প্রধান উৎপাদনস্থল ছিল সেই হাওর এলাকার মানুষ দেশী মাছের স্বাদ ভুলে গেছেন। মাছের বাজার ঠাসা থাকে চাষের মাছে। হাওর অঞ্চলের মানুষ একসময় চাষের মাছকে অবজ্ঞা করতেন। আজ সেই অবস্থা নেই। সাধ্যের মধ্যে মাছ খেতে চাইলে চাষের মাছ ছাড়া গত্যন্তর নেই। দেশী মাছ খাওয়া হয়ে উঠেছে বিলাসিতার নামান্তর। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ছোট বড় শতাধিক জলাশয় থাকার পরও বাজারে দেশি মাছের আকাল নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ওখানে বলা হয়েছে বিল-জলাশয়ে এখন যে সামান্য পরিমাণ দেশী মাছ পাওয়া যায় তা সরাসরি ঢাকার আড়তে চলে যায়। স্থানীয় বাজারে দেখা যায় না এসবের ছিটেফোটা। প্রতিবেদনটি শান্তিগঞ্জকেন্দ্রীক হলেও এ চিত্র পুরো হাওরাঞ্চলের, সারা দেশেরই। এক ধরনের মোহ, ভ্রান্তি ও অজ্ঞতার কারণে আমরা নিজেদের একটি অতিশয় মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করে ফেলেছি। এর ফল হয়েছে এখন বহু দেশী জাতের মাছের সেই ঐতিগ্যগত সনাতন স্বাদ নেই। এইসব মাছ নিজের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আরেক শংকর চরিত্র ধারণ করেছে। জলাশয়ে চাষের যে রুই কাতলা বা অন্য মাছ চাষ হয় তার কিয়দংশ নানাভাবে মুক্ত জলাশয়ে চলে গিয়ে দেশী মাছের সাথে মিশার সুযোগ পেয়ে যায়। চাষের মাছ আর দেশী জাতের মাছের শংকরায়নের ফলে এখন বিল-জলাশয়ের তথাকথিত দেশী মাছও হয়ে উঠেছে চাষের মাছের মতই কৃত্রিম। শোনা যায় বিলের ইজারাদাররা নাকি এখন মাছের উৎপাদন বাড়াতে বিলেও খামারের পোনা ছাড়েন। তো এরকম এক ঐতিহ্যবিনাশী অবিবেচক জাতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কি-না আমরা জানি না। বিল-নদী-জলাশয়ের এই দেশে কেন খামারের মাছ চাষ করে প্রোটিনের চাহিদা মিটাতে হবে এটা বিশেষজ্ঞদের মাথায় কাজ করলেও দেশের কৃষক-জেলে সাধারণ মানুষ বুঝতে অক্ষম।
খামারের মাছের ফলন বাড়াতে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া হয় তার ভগ্নাংশও যদি দেশী মাছের জন্য দেয়া হত তাহলে এই সুজলা দেশে কখনও আদি ও অকৃত্রিম জাতের দেশী মাছের আকাল পড়ত না। এই মাছ বিদেশে রপ্তানি করেই আমরা চলমান উন্নয়ন অভিযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে পারতাম। কিন্তু কোথায় কি। হুজুগে মাতি আমরা। বিদেশি ব্যবস্থাপত্রে চলি। আমরা নিজেদের মগজ ব্যবহারে নিতান্তই কার্পন্য অনুভব করি। সাধারণ অংশীজনের মতামতের থুরাই তোয়াক্কা করি। এই করে করে আমাদের কৃষি, মৎস্য; সবকিছুকেই এখন বিদেশ নির্ভর করে ফেলেছি। এ থেকে উত্তরণের তাগিদও দেখি না কারও মাঝে । এ বড় আত্মঘাতী প্রবণতা আমাদের। একটু সতর্কতা ও ব্যবস্থাপনার ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো যায় আর দেশী মাছের বংশ রক্ষা করা যায় না এটি কেউ বিশ^াস করে না।
আমরা বাপ-দাদা-চৌদ্দ পুরুষের রসনা-বিলাসে ফিরে যেতে চাই। নিজের ঐতিহ্যে ফিরে যেতে চাই। উৎসমুখে ফিরে যাওয়ার এই তাগিদ থেকে দেশের মৎস্য খাতের যারা হর্তা-কর্তা তাঁদের নিকট বিনয়ের সাথে আহ্বান জানাই দেশী প্রজাতির মাছের বংশ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার। এজন্য তেমন কোন বিজ্ঞানের প্রয়োজন নেই। দরকার সঠিক ব্যবস্থাপনা আর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। এজন্য ইলিশ মাছের মত কিছু বিষয় মেনে চললেই চলে। যেমন পোনা ও ছোট আকারের মাছ ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ, প্রজননের জায়গাগুলোকে নিরাপদ ও অনুকূল করা; এমনসব কর্মকা- বাস্তবায়ন করতে পারলেই দেশী মাছের উৎপাদন বাড়ার পরিবেশ তৈরি হয়ে যাবে। এসব বিষয় আমাদের আইনে এখনও রয়েছে। নতুন আইনেরও দরকার নেই। তাই বলি দরকার শুধু ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদ।