দেশের সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ জেলা সুনামগঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার
দেশের সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ জেলা সুনামগঞ্জ। ১৬ বছরের একটি সমীক্ষায় এই তথ্য পাওয়া গেছে। শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর হাসনরাজা মিলনায়তনে ‘বজ্রপাত সংগঠনে আবহাওয়া জনিত অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশ বজ্রপাত মোকাবেলায় সহনশীল জনগোষ্ঠী গঠনে প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও আবহাওয়া যন্ত্রপাতি স্থাপন’ শীর্ষক সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের আয়োজনে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মশালায় জাানানো হয়, গত ১৬ বছরে দেশব্যাপী বজ্রপাতের ঘটনা অনুসন্ধান করে জানা গেছে, দেশের পাঁচটি অধিক বজ্রপাত প্রবণ জেলার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সুনামগঞ্জ। বজ্রপাতে দেশে মোট প্রাণহানির ৪.৮২ শতাংশ ঘটেছে সুনামগঞ্জে।
কর্মশালায় বক্তারা জানান, বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থান। এ জেলার উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে হবিগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা এবং পশ্চিমে নেত্রকোণা জেলা। সুনামগঞ্জের অবস্থান মেঘালয়ের খুব কাছে, যাকে ভৌগোলিকভাবে শিলং বা মেঘালয় মালভূমি বলা হয়। মেঘালয় মালভূমির উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫০ থেকে ১৯৬১ মিটার পর্যন্ত হয়। মেঘালয়ের জলবায়ু মৌসুমী বায়ু’র প্রভাবে পরিবর্তিত হয়। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত প্রায় ২৬ শ’ মিলিমিটার এবং উত্তর মেঘালয়ে আড়াই হাজার
থেকে তিন হাজার মিলিমিটারের মধ্যে। দক্ষিণ-পূর্ব মেঘালয়ে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ চার হাজার মিলিমিটারের উপর। চেরাপুঞ্জিতে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়। যা প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার মিলিমিটারের বেশি। উত্তরে মেঘালয়ের উঁচু পাহাড় এবং সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ-পূর্বে ত্রিপুরা অঞ্চলটি একটি ফানেলের আকার গঠন করে যা এই অঞ্চলের মেঘ সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বজ্রঝড় এবং বজ্রপাতের ঘন ঘন এবং আকস্মিক ঘটনাগুলো সুনামগঞ্জ ও আশপাশের ভৌগোলিক অবস্থার বিরূপ প্রভাবের কারণেই হয়ে থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে সুনামগঞ্জের হাওরগুলো বাস্পীভবনের উৎস যা মেঘের আকার ধারণ করে এবং অবশেষে চারপাশের ভৌগোলিক অবস্থার কারণে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
কর্মশালায় বজ্রপাত মোকাবিলায় সহনশীল জনগোষ্ঠী তৈরিতে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে এই বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করা হয়। সুপারিশ’এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয়ভাবে বজ্রপাতজনিত মৃতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে বজ্রপাতের পূর্বাভাস প্রদান করা ও বজ্রপাত হতে সুরক্ষার কৌশলসমূহ জনগণের মাঝে স্বল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া আবশ্যক। এলক্ষে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়নসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন। তাই বিদ্যমান প্রশাসনিক স্তরগুলোর দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে জেলা বজ্রপাত ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের লক্ষে একটি পরিপূর্ণ অর্গানোগ্রাম তৈরি এবং সেই মোতাবেক বজ্রপাতের পূর্বসতর্ককতা প্রদান করার জন্য একটি প্রস্তাবনাও তুলে ধরা হয় কর্মশালায়।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে বজ্রপাত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর হার হ্রাস করার লক্ষ্যে নতুন করে বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। কৃষক, দিনমজুর ও জেলে সম্প্রদায়ের জন্য বিস্তৃত খোলা মাঠ এবং বিশাল হাওর এলাকায় একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। এ আশ্রয় কেন্দ্রগুলো বছরের বিভিন্ন সময় ধান মাড়াই, মওজুদ, শুটকি তৈরি ও মওজুদ ইত্যাদির কাজে ব্যবহার করা যাবে। এ ভবনগুলো বজ্রপাত তথ্যকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান ভবনগুলোতে বজ্রনিরোধক দ- স্থাপনের মাধ্যমে ভবনগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উপযুক্ত স্থানে বজ্রপাত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের লক্ষ্যে ভৌগোলিক স্থানিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য। এ বিষয়ে একটি উপযুক্ত গবেষণাও প্রয়োজন। জনগণকে বজ্রপাতের সময়, পূর্বে ও পরে করণীয় বিষয়ে সচেতন ও শিক্ষিত করতে হবে। বজ্রপাত সংঘটের মৌসুমগুলোর প্রাক্কালে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সপ্তাহকে ‘দুর্যোগ সচেতনতা সপ্তাহ’ হিসাবে ঘোষণা দেয়া প্রয়োজন। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বজ্রপাতসহ সকল দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। মৃত্যুর হার হ্রাস পাবে। বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা নিয়মিতভাবে রেকর্ড করা দরকার এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করা জরুরি। হতাহতের খবর স্থানীয় ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে ইউএনও অফিসে প্রেরণ করা এবং ইউএনও অফিসের সংবাদটি প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেসে প্রেরণ করা যেতে পারে। এই ডাটাবেসটি বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হবে। প্রতি ঘণ্টায় বজ্রপাতের পূর্বাভাস তৈরি করে প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপস ও সিস্টেমগুলো ব্যবহার করে মাঠ পর্যায়ের সকল মানুষের নিকট বজ্রপাতের পূর্বাভাস পৌঁছানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
কর্মশালায় সূচনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ আহমদ, বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, ড. আসিফ আহমদ, প্রফেসর ড. দেওয়ান আব্দুল কাদির, উপ-সচিব মো. কোরবান আলী।
অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গির আলম, সরকারি এসসি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ মসহুদ চৌধুরী, শিক্ষক ইসমাইল হোসেন ও তাপস রায় চৌধুরী।
কর্মশালায় জেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ইউপি চেয়ারম্যান, কৃষক, মসজিদের ইমাম ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।