দোয়ারায় নদী ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না

বিশেষ প্রতিনিধি
দাদারখালি বাড়ি আছিল দুইটা, একটা ৬ কেয়ারি (২একরের) আরেকটা ৩ কেয়ারি (এক একরের)। দুইটাঔ নদীত গেছেগি। অখন বাপেরখালি ছন কিত্তাত প্রধামন্ত্রীর দেওয়া ঘরে আছি। আর ৫০ ফুট নদী ভাঙলে ইঘরও যাইবোগি। পানি কমার সাথে সাথে নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। নদী ভাঙনের কাজের ঠিকাদারেরা অপেক্ষা করের পানি আইতো, আর তারা ১০ বস্তা ডাম্পিং কইরা ১০০ বস্তার বিল নিতো, নদী ভাঙন আটকানির লাগিতো কাম নায়, কাম কোটি কোটি টাকা লুটপাটের লাগি। অখন বস্তা পালাইলে ভাঙন আটকিলোনে, আমরা চিল্লাইয়াও কোন লাভ অর না।’
দোয়ারাবাজারের মাঝেরগাঁওয়ের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে এভাবেই উপজেলা সদরের নদী ভাঙনের কষ্টের কথা বলছিলেন।
এই উপজেলা সদরের মাছিমপুর, মুরাদপুর ও মাঝেরগাঁও এলাকা ৩০ বছর ধরে ভাঙছে। বিএনপি শাসনামলে ২০০১ সালে নদী ভাঙন ঠেকাতে বিপুল অংকের টাকা বরাদ্দ হলেও ওই সময়ে অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ভাঙন ঠেকানো যায় নি। নদী ভাঙন রোধের বরাদ্দের টাকা হাতিয়ে নেওয়া নিয়ে ওই সময়ে দলীয় লোকদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি।
গত প্রায় ৩০ বছরে দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের মাছিমপুর গ্রামের ১০০ টি বাড়ি, মুরাদপুরের ৫০ টি বাড়ি, মাঝেরগাঁওয়ের ১০০ টি বাড়ি, দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের ৬০ টি দোকানকোঠা নদীতে বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙন ঠেকাতে কয়েক দফায় জরুরি ভাঙন রক্ষা কাজের নামে বরাদ্দ হয়েছে। যার বেশির ভাগ টাকাই লুটপাট হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম জানালেন, বিএনপির সময়কাল থেকে এখনকার সময় পর্যন্ত কয়েক দফায় নদী ভাঙন ঠেকানোর জন্য বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ভাঙন রোধ হয় নি। তার মতে, ভাঙলেই সংশ্লিষ্টদের লাভ বেশি। তিনি জানালেন, এই মাসের মধ্যে ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ না ফেলা হলে নদী ভাঙন আরও বাড়বে।
মাঝেরগাঁওয়ের ভুট্টা মিয়া বললেন, আমরা তিন ভাই, এক ভাইয়ের বাড়ির চিহ্নও নাই, গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়েছে তাকে, আমরা দুই ভাইয়ের বসত ঘরও নদীতে গেছে, কোনভাবে ছাপড়া বানিয়ে বসবাস করছি। ঠিকাদারের লোকজনের পেছনে পেছনে ঘুরতেছি চৈত্র মাস আসার আগে বস্তা ফেলার জন্য, তারা আমলে নিচ্ছে না।
একই গ্রামের পাবেল ইসলাম বললেন, বাপ চাচা চারজন পাশপাশি বাড়িতে থাকতেন। ২ জনের বাড়ি নদীতে গেছে। আমাদের বসত ঘরের মাঝখানে ফাটল দেখা দিয়েছে। আরেকজনেরও ভাঙার উপক্রম। পানি কমা শুরু হতেই ভাঙন বেড়েছে। এখন বস্তা ফেললে বস্তা ঠিক থাকতো, ঠিক স্থানে পড়তো, আর কয়দিন পরে বস্তা ফেললে এভাবে কাজে আসবে না।
দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বললেন, নদী ভাঙন কাজে গতি নেই বললেই চলে, একদিন ব্লক বানানোর কাজ হলে তিনদিন বন্ধ থাকে। ভাঙনে বস্তা ফেলার এখনই ছিল উপযুক্ত সময়, কিন্তু তারা সেটি করছেন না।
এবার দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের নদী ভাঙন ঠেকাতে নয়টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৮৩ কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার আতাউর রহমান খান লিমিটেড ৫ টি গ্রুপে ৪৬ কোটি টাকা এবং নেত্রকোণার ঠেকবে এ- প্রিতম জয়েন্ট ভেঞ্চারে ৪ টি গ্রুপে ৩৭ কোটি টাকার কাজ করছে।
ভাঙন এলাকায় প্রকল্পের সাইনবোর্ডে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের ফোন নম্বর না দেওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুইজন প্রকৌশলীর মুঠোফোন দেওয়া থাকলেও তাঁরা স্থানীয়দের ফোন না ধরার অভিযোগ আছে।
আতাউর রহমান খান লি.’এর পক্ষে কাজ দেখভালকারী প্রকৌশলী নুরুজ্জামানের কাছে নদী ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ কেন ফেলা হচ্ছে না জানতে চাইলে, তিনি বললেন, বালু পেতে সমস্যা ছিল, এখন সরকারকে রয়েলিটি দিয়ে বালু ওঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। বালু পাওয়া গেলেই জিও ব্যাগ ফেলা হবে। তিনি বললেন, তাদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত কাজের সময়সীমা আছে। এবার পানি আসার আগে পর্যন্ত যেটুকু সম্ভব জিও বস্তা ফেলা হবে, বাকীটা পরের শুকনো মওসুমে হবে। বর্ষার পানিতে বস্তা ফেলবেন না তারা।
টেকবে এ- প্রিতম এন্টার প্রাইজের বিপ্লব সিংহও একই কথা বললেন। বললেন, বালু পেতে সমস্যা হচ্ছে। সামনের সপ্তাহে হয়তো বস্তা ফেলা যাবে। আর কয়েকদিন পর পানি আসার কথা স্বীকার করে বিপ্লব বললেন, এই কয়দিনের মধ্যে যা কাজ করা যায় করতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শমশের আলী বললেন, এই কাজে অনিয়ম করার সুযোগ নেই। নি¤œমানের ব্লক হওয়ায় ইতিমধ্যে এই কাজের ২৬ লাখ টাকার ব্লক বাতিল করা হয়েছে। পানি আসলে বস্তা ফেলে সংখ্যা গণনায় অনিয়মের কোন সুযোগ নেই। ১৫ দিনের মধ্যে বস্তা ফেলতে হবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামছুদ্দোহা বললেন, আগে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা লাগবে। পরে ব্লক বিছানো লাগবে। বেশি পরিমাণে ব্লক তৈরি করে একসঙ্গে কাজ করলে ভালো হয়। কিছু দিনের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলে ব্লক বিছানোর কাজ শুরু হবে। পানি আসলে ফেলা হবে, এমনটা নয়, অনিয়মের কোন সুযোগ দেওয়া হবে না।
প্রসঙ্গত. ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে দোয়ারাবাজারের নদী ভাঙন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এই প্রকল্পের মেয়াদকাল আগামী বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। গেল দুই বছরে কাজের অগ্রগতি একেবারেই কম জানিয়েছেন স্থানীয়রা।