দোয়ারায় বাঁধের কাজ এখনও শেষ হয়নি

একই ব্যক্তির একাধিক বেড়িবাঁধ
আকরাম উদ্দিন
সুনামগঞ্জের দোয়ারা উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ২১টি পিআইসি’র বেড়িবাঁধের মধ্যে বেশিরভাগ পিআইসি’র বাঁধের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এই ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। একাধিক বেড়িবাঁধে মাটি ভরাট, ঘাস লাগানো, দূর্মুজ করা এবং বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে এমন অভিযোগের কথা জানান স্থানীয় একাধিক কৃষক।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এবার সুরমা ইউনিয়নের ফসলরক্ষা বেড়িবোঁধের কাজ ভাল হয় নি। কোনো কোনো ফসলরক্ষা বাঁধের বেশিরভাগ অংশে মাটিই ভরাট হয়নি। ঘাস লাগানো, দুর্মুজ করা, বাঁধের দৈর্ঘ্য, প্রস্ত ও উচ্চতার সঠিকতা নিয়ে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম রয়েছে বাঁধ নির্মাণে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক জানান, সুরমা ইউনিয়নের ২১টি পিআইসি’র বেড়িবাঁধের মধ্যে বেশিরভাগ পিআইসি এখলাছুর রহমান ফরাজি ও তাঁর আত্মীয় স্বজনের নামে রয়েছে। সবকিছু সামলে এবারের পিআইসি’র বেড়িবাঁধ নির্মাণ একই ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে থাকায় বাঁধের কাজ ভাল হয় নি। সুরমা ইউনিয়নের ১ নম্বর পিআইসি এখলাছুর রহমান ফরাজির নামে আছে। ৩ নম্বর পিআইসি এখলাছুর রহমান ফরাজির চাচাতো ভাই সম্পর্কের আত্মীয় মো. আতাউর রহমান ফরাজির নামে, ২৮ নম্বর পিআইসি আপন ভাতিজা মোশারফ হোসেন ফরাজির নামে রয়েছে। এছাড়াও আরও কয়েকটি পিআইসি রয়েছে এখলাছুর রহমান ফরাজির তত্ত্বাবধানে।
সুরমা ইউনিয়নের খাসিয়ামারা নদীর বাম তীরে অবস্থিত ৬ নম্বর পিআইসি’র নির্মিত বেড়িবাঁধ। এই পিআইসি’র সভাপতি আব্দুল জলিল, সদস্য সচিব মো. রফিক মিয়া। বাঁধে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। এই বাঁধে ৩৬৭৮ ঘনমিটার মাটি ভরাটের নির্দেশনা থাকলেও এই পরিমাণে মাটি ভরাট হয় নি। দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতা এবং ঢালু নিয়ে আছে কৃষকদের নানা প্রশ্ন। ডুবন্ত বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণে যথেষ্ট পরিমাণে বাঁশ স্থাপন করা হয় নি। বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। দুর্মুজ করা হয়নি, ঘাস লাগনো হয়নি। এই পিআইসি’র বাঁধে অবস্থান করে কথা বলার সময় কয়েকজন কৃষক জানান, এই বাঁধের কাজ ১ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি এখলাছুর রহমান ফরাজি তদারকি করছেন।
খাসিয়ামরা নদীর বাম তীরে রয়েছে ৭ নম্বর পিআইসি’র নির্মিত বেড়িবাঁধ। এই পিআইসি’র সভাপতি জয়নাল আবেদীন, সদস্য সচিব মো. ইয়াহহিয়া। এই বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ লক্ষ ৩২ হাজার টাকা। এই বাঁধের মীরপুর গ্রামের পাশে তিন স্থানে মাটি ভরাট হয়নি। যতটুকু কাজ হয়েছে দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতা এবং ঢালু নিয়ে সন্দেহ আছে কৃষকদের। নির্মিত বাঁধের উপরিভাগে এবং ঢালুতে দুর্মুজ করা হয়নি, ঘাসও লাগনো হয়নি। কৃষকরা জানান, এই বাঁধের কাজ ১ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি এখলাছুর রহমান ফরাজির তদারকিতে আছে।
দোয়ারা উপজেলার কানলার হাওরপাড়ের ৩ নম্বর পিআইসি’র সদস্য সচিব মো. মাসুদ মিয়া বলেন, আমি বাঁধের কাজ করাচ্ছি। এই বাঁধের বরাদ্দ সম্ভবত: ২২ লক্ষ টাকা। একটি তদন্ত দল বেড়িবাঁধ পরিদর্শনে আসায় আমার সমস্যা হয়েছে। বাঁধে মাটি ভরাট কম থাকায় নতুনভাবে মাটি ভরাট করাতে হচ্ছে। ক্লোজারে বাঁশ স্থাপন, ঘাস লাগালো ও দুর্মুজ করায় সমস্যা থাকায় নতুনভাবে কাজ করছি।
২৮ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি মোশারফ হোসেন ফরাজী বলেন, আমি কিছু বলতে পারবো না। ১ নম্বর পিআইসির সভাপতি এখলাছুর রহমান ফরাজি বাঁধ সম্পর্কে সকল তথ্য দেবেন। ওই পিআইসি’র সদস্য সচিব ছোট ভাই ইলিয়াছ ফরাজী।
৭ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি মো. আব্দুল জলিল বলেন,আমার রাবারড্যাম এলাকার বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হয়নি। আরও ১০-১৫দিন লাগবে।
৬ নম্বর পিআইসি’র সদস্য সচিব ইয়াহহিয়া বলেন, আমার পিআইসি’র রাবারড্যাম মীরপুর এলাকায় বেড়িবাঁধে ৩ স্থানে মাটি ফেলার বাকি। ভাঙনে মাটি ভরাট, বস্তা ফেলা, বাঁশ পোঁতা, বাঁধের উপরিভাগে ড্রেসিং করার কাজ রয়েছে। এই বেড়িবাঁধ টেংরার এখলাছুর রহমান ফরাজীর।
২৬ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, ভাঙায় বল্লী স্থাপন, বস্তা ফেলা, বাঁধের উপর ড্রেসিং ও ঘাস লাগানো বাকি রয়েছে। আরও সপ্তাহখানেক সময় লাগবে বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হতে।
১ নম্বর পিআইসি’র সভাপতি এখলাছুর রহমান ফরাজি বলেন, আমার বাঁধের কাজ শেষ হতে আরও সপ্তাহ দশ দিন লাগবে। একাধিক পিআইসিতে তাঁর স্বজনরা আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার নিজস্ব ট্রাক, ট্রলি ও এক্সেভেটর আছে। আমি বাঁধে মাটি ভরাটের কাজে ব্যবহার করি। এই জন্য অনেকে বলেন এসব বেড়িবাঁধ আমার ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেবাংশু কুমার সিংহ বলেন, আমার জানামতে ৬ ও ৭ নম্বর পিআইসি’র বেড়িবাঁধের কাজ শেষ। যদি শেষ না হয়, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারি বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজের মেয়াদ শেষ। তবুও কাজ চলমান আছে দোয়ারা উপজেলায়। হয়তো ২-৪ দিনের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হয়ে যাবে।