ধর্মপাশা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির উপর গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনটি যেকোন সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিকেই আহত করবে নিঃসন্দেহে। উপজেলা সদরে শিল্পকলা একাডেমি নামে একটি ভবন আছে। তার একটি কমিটিও আছে যদিও কমিটির প্রধান কোন সংস্কৃতিবান ব্যক্তি নন, একজন সরকারি কর্মকর্তা। সবকিছু থাকার পরেও যেন কিছুই নেই ওখানে। সুন্দর প্রতীমার মতো একটি দৃশ্যমান বস্তু আছে কিন্তু এর ভিতরে নেই প্রাণের অস্তিত্ব। ব্যাপারটা এরকম। শিল্পকলা একাডেমি মানেই এখানে থাকবে গান বাজনা থাকবে নাটক কবিতার আসর থাকবে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন। হারমোনিয়াম, তবলার বুল ভেসে আসবে এর ভিতর থেকে। গান কবিতার টুকরো টুকরো কথা ভেসে আসবে বাতাসে। তবেই না বুঝা যাবে এটি শিল্প সংস্কৃতির কাজে নিয়োজিত একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসবের কোন বালাই নেই । ফলত পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙ্গে পড়েছে, ভবনের ভিতর জমেছে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। সবচাইতে দুঃখের বিষয় হলো এই ভবনটিকে ঘিরে লোকজন নাকি মলমূত্র ত্যাগ করার মতো কাজটিও সেরে ফেলেন নির্বিঘেœ। ধর্মপাশার সংস্কৃতিসেবীমহল সঙ্গত কারণেই শিল্পকলা ভবনের এমন অশৈল্পিক অবস্থায় মর্মপীড়ায় ভোগছেন। আমরাও খবরটি জানার পর স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। মনের ভিতর এক ধরনের ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। এই দেশে আমরা প্রতিবছর সরকারি টাকার কতো সদ্ব্যবহার-অপব্যবহার করি। দশ টাকার কাজকে ১০০ টাকার এস্টিমেট বানিয়ে কিংবা আদৌ কোন কাজ না করেই কত টাকা হজম করে ফেলি। কিন্তু যখন শিল্প-সংস্কৃতি খাতে খরচের বিষয় আসে অথবা এগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের প্রশ্ন আসে তখন আমরা অনেকেই নাক সিঁটকাই। তাচ্ছিল্য করি সংস্কৃতিসেবীদের। এই আমরা যারা এই অবজ্ঞা করি তারা মূলত বর্তমান সমাজের উচ্ছিষ্টভোগী, শিকড়বিচ্ছিন্ন, গর্বিত ধরনের প্রকৃত শিক্ষার ছুঁয়াবিহীন কিছু লোক। মূলত এই আমাদের ক্ষমতা ও প্রভাব এতোটাই বেশি যেখানে সমাজ বুক টান করে দাঁড়িয়ে থাকে যেসব কাঠামোর উপর অবলীলায় সেইসব কাঠামোকে তাচ্ছিল্য করার মুর্খামি করি। নতুবা একটি উপজেলা সদরের শিল্পকলা একাডেমির এমন করুণ অবস্থা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হতো না।
ব্যক্তিমানুষের মননশীলতা তৈরি করে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি চর্চার বিষয়, ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়। লুকিয়ে সংস্কৃতিচর্চা হয় না। এটি সুন্দরের প্রকাশ্য মহড়া যাতে সকলেই এর মধ্যে গিয়ে নিজেকে আরও হৃদ্ধ করতে পারে। সুসংস্কৃতি সমাজের বহু পাপাচার রুদ্ধ করে দিতে পারে। সমাজে আজ নৈতিকতার যে অধঃপতন, বিশ্বাসের যে কুৎসিৎ বিভৎসতা, আন্তব্যক্তি সম্পর্কের যে অবনমন-এর পিছনে রয়েছে সঠিক সংস্কৃতি চর্চার অভাব। এইভাবে উদাসীনতা আর অবহেলা দেখিয়ে আমরা একটি জাতিকে কোথায় নামিয়ে এনেছি তার বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করছি বার বারই। সরকার সংস্কৃতির লালন ও প্রসারে যথেষ্ট আন্তরিক। এই খাতে সরকারি বরাদ্দ অতীতের যেকোন সময়ের চাইতে এই সরকারের আমলে বেশি। সংস্কৃতি চর্চার পরিমাণগত আধিক্যও চোখে পড়ার মতো। এরকম একটি সময়ে ধর্মপাশার শিল্পকলা একাডেমিটি গণশৌচাগারে পরিণত হতে পারে এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন।
শিল্পকলা একাডেমিগুলো যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের নিকট আমাদের অনুরোধ অবিলম্বে আপনারা ধর্মপাশায় প্রকৃত সংস্কৃতিসেবীদের দিয়ে একটি উপযুক্ত কমিটি গঠন করে জরাজীর্ণ একাডেমি ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নিন। এতে সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ তৈরি করুন। আমরা মনে করি ধর্মপাশায় প্রচুর সংস্কৃতিবান মানুষ আছেন। আজ তাঁদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলার। আমরা তাড়াতাড়িই ধর্মপাশা শিল্পকলা একাডেমির বিষয়ে ইতিবাচক সংবাদ দেখতে চাই পত্রিকার পাতায়। দেখতে চাই অপসংস্কৃতি প্রতিরোধে ধর্মপাশার এই প্রতিষ্ঠানটি সুন্দরের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
- প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়েছে চলতি নদী-পাল্টে গেছে মানচিত্র
- ‘প্রস্তাব মেনে নির্বাচন হলে শেখ হাসিনা ফের প্রধানমন্ত্রী’

