ধর্মের নামে কূট অভিসন্ধি উপেক্ষণীয় নয়

ভারতীয় তথাকথিত ‘ধর্মগুরু’ গুরমিত রাম রহিম সিং কর্তৃক তার আশ্রমের সাধ্বীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ২০ বছর কারাদ- হওয়ায় উপমহাদেশে ধর্মের নামে কিছু লোক আসলে কী করছেন তার আরেকটি দিক সকলের সামনে আসল। এই ‘ধর্মগুরু’র বিরুদ্ধে ১৫ বছর আগে মুখ খুলেছিলেন তার দুই মহিলা শিষ্য। এক অসম বিচারিক লড়াইয়ে অবশেষে এই মহা প্রতাপশালী ‘গুরু’ ন্যুনতম শাস্তির খরগ এড়াতে পারেন নি। যদিও অভিযোগকারীরা এই দ-ে খুশি হননি তারা এই গুরুর সর্বোচ্চ শাস্তি আশা করেছিলেন। কিন্তু ভারতের মতো একটি দেশে যেখানে মানুষের মনোজগত কার্যত নিয়ন্ত্রণ করে কোন না কোন ধর্মীয় ভাবাবেগ, সেখানে একজন ‘ধর্মগুরু’ যার কিনা আবার অগণিত শিষ্য ছড়ানো রয়েছে, তাকে বিচারের মুখোমুখি করাটাই একটি বড় সাফল্য। এই ‘গুরু’ দোষী হিসাবে প্রমাণিত হওয়ার পর তার শিষ্যদের তা-ব সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। ওই উন্মাদ শিষ্যদের নৃশংস উন্মত্ততায় প্রায় অর্ধ শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। এ রকম প্রেক্ষাপটে একটি যুগান্তকারী রায় বেরিয়ে আসাটা মানব সভ্যতার জন্য আশাব্যঞ্জক । এজন্য অসীম সাহসে দাঁড়িয়ে যারা বিচারিক প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন যাবৎ মোকাবিলা করে এসেছেন তাদের আমাদের প্রাণখোলা অভিনন্দন।  
মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশসহ বিশ্বের বহু দেশ আজ এক ধরনের ধর্মীয় উন্মাদনায় আক্রান্ত। কি ভারত কি পাকিস্তান এমনকি আমাদের প্রিয় স্বদেশভূমি বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ধর্মীয় জিকির তুলেই একাত্তরে এই দেশে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন চালানো হয়েছিল। আবার যখন এই ঘৃণ্য অপরাধীদের বিচারিক প্রক্রিয়ার সামনে দাঁড় করানো হলো তখন একটি মহল এর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হতে দ্বিধা করেনি। পাশাপাশি কুহকাশ্রয়ী ধর্মীয় আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ‘জেহাদ’ নাম দিয়ে আরেক হিং¯্রতার বিস্তার দেখছি আমরা কয়েক বছর ধরে। ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী উপলব্ধি না করে এই যে উন্মাদনা, এর পিছনে যতোটা না ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতি কাজ করে তার চাইতে বেশি কাজ করে জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বহু জটিল হিসাব-নিকাশ। সমস্যা হচ্ছে উপমহাদেশের সচেতন মানুষেরা ধর্মীয় উন্মাদনার পিছনে যে রাজনীতি-অর্থনীতির সংযোগ সেটিকে বেমালুম উপেক্ষা করে চলেছেন। যারা উপেক্ষা করছেন না তাদের কণ্ঠ ভাবাবেগাক্রান্তদের উচ্চকণ্ঠের নিচে চাপা পড়ে যায়। এই উপেক্ষা করার ফল হয়েছে যে, অনেকটা বিনা বাধায় আমাদের সমাজে প্রজন্ম বিনষ্টকারী ধর্মীয় উন্মাদনা আরও পরিপুষ্ট হচ্ছে।
গুরমিত রাম-রহিম সিংরা যেমন ঈশ্বরের সন্তুষ্টির চাইতেও নিজের সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তেমনি ওসামা বিন লাদেন বা তার অনুগতরাও যে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধন করতেই সচেষ্ট সেটি বুঝা এবং বুঝানো এখন সবচাইতে বেশি জরুরি। নতুবা আমাদের সংগ্রামী মানুষেরা শ্রমে ঘামে একটু একটু করে সভ্যতার যে স্তরে প্রবেশ করেছেন সেখান থেকে আবার পিছিয়ে যেতে হবে অনেক অনেক পিছনে। এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে আরও ভালর দিকে এগিয়ে যাওয়া। আজ যেখানে আছি সেটিকে অতিক্রম করে আরও উন্নততর জায়গায় পৌছানো। কিন্তু পৃথিবীব্যাপী তথাকথিত মৌলবাদী উন্মাদনার বিষাক্ত থাবা পৃথিবীর যাবতীয় অর্জনকে ধ্বংস করতে চাইছে। সেখান থেকে এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে আজ সকলকে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। ‘ধর্মগুরু’ রাম রহিম সিংহের বিরুদ্ধে ভারতের কিছু লোক যেভাবে প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়েছেন সেটি নিরাশার মাঝেও কিছুটা আশার সঞ্চার করে।