ধান উৎপাদনের উপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে

উচ্চ ফলনশীল (উফসি) বা হাইব্রিড ধান চাষের আগ্রাসনের কারণে দেশি জাতের ধানের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে চলেছে। হতে চলেছে বললে ভুল হবে, বরং বলা ভালো— বিলুপ্ত হয়েই গেছে। কোন সম্পন্ন কৃষক হয়ত এখনও শৌখিনতার বশে নিজের সামান্য কিছু জমিতে স্থানীয় জতের রাতা, বিরই, শাইল বা অন্য ধান এখনও উৎপাদন করেন, তবে তা নেহায়েৎই অতি অল্প পরিমাণে, নিজের পরিবারে মাঝে—মধ্যে খাবার জন্য। এই শৌখিনতার বাইরে ধানের উৎপাদনের পুরোটাই এখন উফসি বা হাইব্রিডের দখলে। স্থানীয় জাতের একর প্রতি ফলন কম, প্রধানত এ কারণেই কৃষকরা উফসি ধান চাষে ঝঁুকেছিল। সেই যে ঝঁুকেছে আর ফেরানো যায়নি। অতি ফলনের আশায় কৃষকদের এই উফসিপ্রীতি আখেরে আমাদের কৃষি ব্যবস্থার উপর কৃষকদের সনাতনী স্বাধীনতাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। উফসি বা হাইব্রিড ধান উৎপাদনের পুরোটাই বিদেশ ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নির্ভর। সবচাইতে ভয়ানক বিষয় হলোÑ এর বীজ কিনতে হয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এই বীজ ধান আমদানিকৃত। ফলে কোন কারণে বিদেশ থেকে বীজ আসা বন্ধ হলে কৃষকদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া ধান উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ যেমনÑ সেচের জন্য পাওয়ারপাম্প, কীটনাশক, সার, কৃষি যন্ত্রপাতি; সবকিছুই বড় পুঁজির প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নির্ভরশীল। আগে কৃষকরা যখন স্থানীয় জাতের ধান উৎপাদন করতেন তখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার পুরোটাই তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিজেরাই বীজ ধান সংরক্ষণ করতেন। ভাটি এলাকায় তেমন সারের প্রয়োজন হত না। নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহার করেই তারা সেচের চাহিদা মিটাতেন। এখন এর সবকিছুই টাকা দিয়ে কিনতে হয়। পুঁজিবাদী বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি বা সরবরাহ ঘাটতি ঘটিয়ে কৃষকদের নিকট থেকে বাড়তি পয়সা হাতিয়ে নেয়া হয়। তবু কৃষকরা বাড়তি ফলনের আশায় এসব অত্যাচার সয়ে আসছেন।
দেশে যেহেতু জমির পরিমাণ বাড়ানোর উপায় নেই, তাই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মিটানোর জন্য ধানের উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। স্থানীয় জাতের পরিবর্তে উফসি বা হাইব্রিডে কৃষকদের যেতেই হবে। এই জায়গায় রাষ্ট্রকাঠামোর দায়িত্ব ছিল নতুন প্রযুক্তির সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা। যে বীজের জন্য আমাদের বিদেশের উপর নির্ভর করতে হয়, কেন সেই বীজ আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্ভাবন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ করতে পারবে না? মূলত বৃহৎ পুঁজি আমাদের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে কোন জায়গায়ই স্বনির্ভর করতে দিতে চায় না। বড় পুঁজির এই কৌশল বুঝে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়াই দেশপ্রেমিক সরকারগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলোÑ আমরা এই জায়গায় সফল হতে পারিনি। বরং বিদেশি ব্যবস্থাপত্র অনসুসরণ করতে আমাদের যত আগ্রহ তার ছিটেফোটারও দেখা মিলে না কৃষি ব্যবস্থাকে পরনির্ভরশীলতা মুক্ত করার জায়গায়। এই জায়গায় অধিকতর গুরুত্ব না দিলে আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি, একই সাথে জাতীয় নিরাপত্তারও সংবেদনশীল উপকরণÑ খাদ্যশস্যের উপর বাইরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে না।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে হাওর এলাকায় দেশীয় জাতের ধান হারিয়ে যাওয়ার উপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ১৫ হাজার দেশীয় জাতের ধানের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রময় ভাণ্ডার রয়েছে আমাদের। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী ও সরকারের দায়িত্ব হলোÑএইসব ধানের ফলন কীভাবে বাড়ানো যায় সে নিয়ে যথাযথ গবেষণা করা। একই সাথে এখন কৃষকরা যে জাতের ধানের ফলনে আগ্রহী সেই ধানের বীজ যাতে দেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদিত হতে পারে তা নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে খাদ্যের উপর যেকোন ঝঁুকি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝঁুকি বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।