বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
‘আমি এখন মহাইল্যা হাওরে আছি। ধান কাটা পুরাপুরি শুরু হইয়া গেছে। পাঁচ হালের মধ্যে দুই হালের মতো কাইট্যালাইছি। দিন যেভাবে ধরাইছে এই রকম সপ্তাহখানেক থাকলে ধান কাটা মোটামুটি শেষ হইয়া যাইব। এই হাওরে প্রায় ছয়আনা ধান কাটা হইয়া গেছে। চব্বিশ তারিখে বৃষ্টি হইব। এর আগে আশা করি এই হাওরের ধান কাটা শেষ হইয়া যাইব।’
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জামালগঞ্জের হালি হাওর পারের মদনাকান্দি গ্রামের কৃষক দেবাশীষ তালুকদার। গ্রামের বিপরীত পারে অবস্থিত বেহেলী ইউনিয়নের মহালিয়া হাওর থেকে তিনি আরও বলেন, ‘ধান পাকছে, এক্কেবারে সুপাকনা যারে কয়। দিন—রাত হাওরেই কাটাইতাছি। পরিবারও সাথে আছে। দুইজনেই কাজ করতাছি। শুধু আমরা না, সবাই সমানতালে ব্যস্ত হইয়া পড়ছে।’
হালি হাওর পারের হাওড়িয়া আলীপুর গ্রামের বড় কৃষক আয়না মিয়া জানিয়েছেন, ধান কাটা শুরু হয়েছে। কোন কোন জায়গায় বেশি, কোন কোন জায়গায় একটু কম। নিজের আবাদকৃত ১৪ হাল (১২ কিয়ারে এক হাল) জমির মধ্যে দুই—তিন হাল জমি কর্তন করেছেন তিনি। বাকি ধানও প্রায় পেকে গেছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে গুছিয়ে আনতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এই কৃষক।
জামালগঞ্জের হাওরে মহা ধুমধামে শুরু হয়েছে বৈশাখী দাওয়া। হাওরের বাতাসে নতুন ধান ও খড়ের মৌ মৌ গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। রেকর্ড তাপমাত্রায় সর্বত্র ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করলেও হাওর পারে ফলন ঘরে তোলার মহোৎসব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সারা বছরের খোরাকি ফলন ঘরে তুলতে সকাল—সন্ধ্যা হাওরেই পড়ে থাকছে কৃষক পরিবারগুলো। বৈশাখী তাপদাহ উপেক্ষা করে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে ফসলের মাঠ। জামালগঞ্জের ছোট—বড় ৬টি হাওরের মধ্যে হালি হাওরেই সবচেয়ে বেশি ধান কর্তন শুরু হয়েছে। পুরো উপজেলায় প্রায় ২৫ ভাগেরও বেশি ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর।
আশপাশের ছোট—বড় কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা যায়, হাওরের প্রায় অনেক অংশেই ধান কর্তনের উপযুক্ত হয়ে গেছে। কিছু কিছু স্থানে ধান পাকতেও শুরু করেছে। অনেক জমিনের মাঝে মাঝে ছত্রাকজনিত ‘ব্লাস্ট’ রোগও ছড়িয়ে পড়েছে। ব্লাস্টে আক্রান্ত ধান ছড়াগুলো দূর থেকে সুপাকনা মনে হলেও মূলত এগুলো মরে শস্যহীন খোসায় পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে কৃষকের মাঝে অতৃপ্তি আছে। তবে সব অস্বস্তি উড়িয়ে বৈশাখী তাপদাহের সাথে পাল্লা দিয়ে হাওর যেন আরও ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলনবান্ধব প্রকৃতি থাকতে থাকতে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে ছেলে—বুড়ো সকলেই এখন হাওরমুখী। গ্রীষ্মের উত্তাপ উপেক্ষা করে কৃষক—কৃষাণীদের কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
পাগনা হাওর পারের কৃষক ও উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ বলেন, অন্যান্য হাওরের তুলনায় পাগনা হাওরে ধান কাটা একটু দেরিতেই শুরু হয়। পাগনায় ধান কাটা শুরু হয়েছে তবে হালি হাওরের তুলনায় কম। এ হাওরে এখন পর্যন্ত ১০ ভাগের মতো ধান কাটা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি যদি অনুকূলে থাকে তাহলে আশা করি পাগনা হাওরে আগামী পনের দিনের মধ্যে ধান কর্তন শেষ হয়ে যাবে। আর যদি বৃষ্টি—বাদল শুরু হয় তাহলে আরও পেছাবে। এ জন্য হাওর রক্ষা বাঁধে কঠোর নজরদারি রাখা প্রয়োজন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, গেল বছরের চেয়ে ১০ হেক্টর জমি বেড়ে এ বছর বোরো আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমি। আবাদকৃত জমিনে এ বছর ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উপজেলায় ছোট—বড় ৬টি হাওরে সোমবার পর্যন্ত প্রায় ২৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ধান কাটা শুরু হয়েছে হালি হাওরে। ধান কাটতে উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে ১৩০টি কম্মাইন্ড হারভেস্টার মেশিন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকেও এসেছে আরও প্রায় ২৫—৩০টি। সবকিছু মিলে দেড় শতাধিক হারভেস্টার মেশিন হাওরে ধান কাটছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ তারিখ থেকে বৃষ্টি হতে পারে। তাই আমরা কৃষকদের ৮০ ভাগ ধান পাকলেই তা কেটে ফেলার জন্য আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকসহ সকলকে আমরা জানিয়েছি— যদি কোথাও ধান কাটতে শ্রমিক সঙ্কট দেখা দেয় তাহলে আমাদেরকে জানাতে। তখন প্রয়োজনে বাহির থেকে শ্রমিক আনা হবে এবং তাদের থাকা—খাওয়ার ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের তরফ থেকে সহযোগিতা করা হবে।
- হাওরে ১ হাজার হারভেস্টার ধান কাটছে -কৃষিমন্ত্রী
- কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও ইফতার বিতরণ


