তাহিরপুর হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘ধান পাকলে বাঁধ নয়, ধান রোপণের সময় বাঁধ দিতে হবে। আন্দোলন আর পরিকল্পনা বাঁধ ভাঙ্গার পরে নয়, বাঁধ গড়ার সময়েই সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে’। এই লক্ষে তারা হাওর এলাকার জনসাধারণকে সচেতন করে তোলার লক্ষে জনসংযোগ শুরুর কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন। সংগঠনটি যথার্থ কথা বলেছে। এটি হলো বাংলা প্রবচনের সেই হাস্যকর প্রবচন চোর গেলে বুদ্ধি বাড়ার বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে চুরি আটকানোর লক্ষ্যে পাহারাদারিকে জোরদার করার ইচ্ছাপ্রসূত। মূলত এরূপ শুভবুদ্ধি রাষ্ট্রের সকল স্তরে সঞ্চারিত হলে হাওরের অনভিপ্রেত বিপর্যয় রোধ করার পাশাপাশি বহু জাতীয় সমস্যার সমাধান সহজতর হয়ে যাবে। গতবছর যখন বিশাল হাওর দুর্নীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বোরো প্রধান সুনামগঞ্জের শতভাগ ফসল ডুবে যায় তখন থেকেই একটি কার্যকর হাওর রক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপর জোড় দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো এখন পর্যন্ত সেরকম কোন নীতিমালার খবর পাওয়া যায় নি। এদিকে বিপর্যস্থ ও সর্বস্ব হারানো কৃষককূল আবারও বোরো চাষ করার প্রস্তুতি শুরু করবেন আর দুই মাস পর থেকেই। তারা হয়তো আবারও অনিশ্চয়তা সামনে নিয়েই ফসল ফলানোর চেষ্টা করবেন। কারণ এ ছাড়া তাদের করার আর কিছু নেই। এই কৃষককূলের বেদনার কাব্য যদি নীতিনির্ধারকরা অনুভব না করেন তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় বটে।
আশার কথা হলো, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক উপজেলায় উপজেলায় গিয়ে হাওরের সমস্যা নিয়ে স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের মতামত শুনছেন। ইতোমধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি উপজেলায় এরূপ গণমতামত সংগ্রহ করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই হাওরের সমস্যা ও এই সমস্যার সমাধান কী, তা এইসব কর্মসূচীর মাধ্যমে অবগত হয়েছেন। জেলা প্রশাসক নিশ্চয়ই তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়গুলো সরকারের উর্দ্ধতন পর্যায়কে অবহিত করেছেন। এবারের সর্বগ্রাসী ফসল হানির পর স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হাওরাঞ্চল ঘুরে গেছেন। এসেছেন সরকারের অনেক দায়িত্বশীল মন্ত্রী, সচিব ও অন্যান্য উচ্চ পদস্থরা। অন্যদিকে গণমাধ্যমসহ সমাজের অপরাপর কার্যকর অংশগুলোও এই বিপর্যয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এতে করে হাওরের বিদ্যমান সমস্যা বিষয়ে প্রচুর বিশেষজ্ঞ মতামত পাওয়া গেছে। এতসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পরেও যদি এবার জুৎসই ফসল রক্ষা বাঁধ ব্যবস্থাপনার দেখা না মিলে-দুর্নীতির মহোৎসব বন্ধ না হয়, তাহলে হাওরবাসীর দুর্ভোগ খন্ডানোর সাধ্য কারও নেই।
আমরা আশা করতে পারি, এবার যথেষ্ট সময় থাকতে হাওর রক্ষা কার্যক্রম সরকার শুরু করবেন এবং অতীতের যত দুর্বলতা ছিল সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। পাশাপাশি হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে দ্রুত কাজ শুরু হবে বলেও আমরা আশায় বুক বাঁধতে চাই। অস্থায়ী ব্যবস্থার চাইতে স্থায়ী সমাধান অধিকতর কাম্য, এই বিষয়টির প্রতি সরকারকে আস্থা স্থাপন করতে হবে। এমন একটি প্রত্যাশার জায়গা থেকে আমরা তাহিরপুর হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে চাই, ধান পাকলে বাঁধ নয়, ধান রোপণের সময়ই বাঁধ চাই।

