নতুন প্রকল্পে কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের নতুন নতুন প্রকল্প নিয়ে জেলা হাওর রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায়ই নানা প্রশ্ন ওঠেছে। কমিটির সদস্যরা বলেছেন, আগের বছরগুলোয় ফসল তলায়নি, এমন হাওরে নতুন বাঁধ কেন হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষেই কাজে আসবে কিনা, নাকি টাকা লুটপাটের ধান্দা করা হচ্ছে, সেটি সংশ্লিষ্টদের নজরে রাখতে হবে। কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরে বাঁধের কাজের জন্য ৭২০টি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭৮টি প্রকল্প জেলা কমিটিতে অনুমোদন হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে ৬৭৮টি। এখন পর্যন্ত কাজ শুরু হয়েছে ৩২৯টি প্রকল্পে কাজ। প্রতিটি প্রকল্পে একটি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) কাজ করবে। নীতিমালা অনুযায়ী, হাওরের প্রকৃত কৃষক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে সাত সদস্যের একটি পিআইসি গঠন করা হয়। বাঁধের কাজে এই পর্যন্ত ৬৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বরাদ্দের চাহিদা আছে ১২৭ কোটি টাকা। গত বছর হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ হয়নি, এমন কিছু নতুন অংশেও এবার বাঁধের কাজ হচ্ছে। জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভায় সদস্যরা বলেছেন, কোটি কোটি টাকার এমন বরাদ্দ প্রকৃত পক্ষেই মানুষের কাজে লাগছে, না-কি লুটপাট হচ্ছে এগুলো কঠোরভাবে মনিটরিংয়ে রাখে হবে।
সভায় জানানো হয়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের কাউয়াজুরি হাওরে এক কোটি ৫৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এর আগের বছর এই হাওরে বাঁধের কাজের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ২৮ লাখ টাকা।
সোমবার বিকালে জেলা হাওররক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উপস্থিত প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট রইছ উদ্দিন আহমদ বলেছেন,
‘আমার বাড়ী দক্ষিণ সুনামগঞ্জে, ওখানকার কাউয়াজুরি হাওরে এর আগে কখনো এতো টাকার কাজ হয়নি, কাজ ঠিকভাবে হচ্ছে কী না, কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী ফারুক আল মামুন এই প্রসঙ্গে বলেন, এই হাওরে বাঁধের কাজ এর আগে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এবং স্থানীয় কৃষকরাই করেছেন। গত বছর (২০১৯ সালে) প্রথম পিআইসিকে দিয়ে বাঁধের কাজ করানো হয়। মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী ডিও লেটার দেওয়ায় হাওররক্ষা বাঁধের জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, পরে ২৮ লাখ টাকার কাজ করানো হয়। এবার এই হাওরে ৫ থেকে ৬ ফুট উচ্চতায় ১৪ কিলোমিটার জুড়ে বাঁধ হবে।
এদিকে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার চলতি নদীর বাম ও ডান পাড়েও এবার বরাদ্দ বেশি দেওয়া হয়েছে। ডান পাড়ে ২০১৮ সালে বাঁধের কাজ হয়েছিল, গত বছর হয়নি। বামপাড়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে একবার কাজ হয়েছিল, এরপর আর হয়নি।
চলতি নদীর ডান পাড়ের ভাদেরটেক গ্রামের বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান জানালেন, চলতি নদীর কোন পাড়েই এখনো বাঁধের কাজ শুরু হয়নি। ডানপাড়ে বাঁধের জন্য শুনেছি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এই বাঁধের বাহাদুরপুরের বাঁধে কিছু মাটি দেওয়া ছাড়া অন্য অংশে মাটি দেবার কোন প্রয়োজন নেই। আদাং এলাকার জিয়াউর রহমান ও মথুরকান্দি’র আলী হোসেনও একই মন্তব্য করেন।
তারা জানালেন, নদীর তীরে বর্তমানে যে সড়ক আছে, পাহাড়ী ঢল সর্বোচ্চ উচ্চতায় গেলেও সেটি ডুববে না। টাকা লুটপাটের জন্য মূলত এই বাঁধে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী মুনসুর রহমান জানালেন, চলতি নদীর ডান তীরের কেবল ভাঙন অংশে কাজ করাবেন তারা, অন্য কোনো অংশে নয়। সেই অনুযায়ী বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
চলতি নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মার্ণের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৩ কোটি ২২ লাখ টাকা। ১৪ টি পিআইসি এই বাঁধের কাজ করবে। বিএনপি শাসনামলের পরে আর এই বাঁধে কোন কাজ হয়নি। চলতি নদীর বাম পাড়ে বড় কোনো হাওরও নেই।
জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল সিদ্দিকী বললেন, পাহাড়ী ঢলে ডলুরাসহ আশপাশের এলাকা তলিয়ে যায়। বিএনপি সরকারের শাসনামলে কাইয়ারগাঁও থেকে অক্ষয়নগর পর্যন্ত জনবসতি ও কিছু ফসলি জমি রক্ষার জন্য প্রকল্প করা হয়েছিল। এরপর আর হয়নি। এলাকার মানুষ চাচ্ছেন এবার ওখানে বাঁধ হোক, এজন্য ওখানে একটি স্থায়ী বাঁধ করা হচ্ছে।