নতুন স্বাস্থ্য মহাপরিচালককে নিয়ে বেশি স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই

আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক হিসাবে ডা. খোরশিদ আলমকে সরকার পদায়ন করেছেন। এর আগে শোনা গিয়েছিল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরও প্রচারিত হয়েছিলো এই পদে সিলেটের সন্তান দেশের বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এনায়েত হোসেন নিয়োগ পেয়েছেন। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির পর জানা গেল খোরশিদ আলমই নতুন মহাপরিচালকের চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন। মহাপরিচালক পদে একই সময়ে দুই বরেণ্য চিকিৎসকের নাম সামনে আসায় বুঝা যায় এ নিয়ে জোর তদবির লবিং ও যোগাযোগ ঘটেছে। এই পদায়নটি নিয়ে শুরুতেই যে বিভ্রান্তি দেখা গেল তাতে একে ভাল শুরু বলার সুযোগ কমে গেলো।
যে প্রেক্ষাপটে পুরনো মহাপরিচালকের পদত্যাগ ও নতুন মহাপরিচালক পদায়ন হলো সেখানে শুরুর এই বিভ্রান্তি ও চমক একটি বার্তা বহন করে, আর বার্তাটি হলো এই পদত্যাগ ও পদায়নের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের মৌলিক পরিবর্তনের কোনো আশা এক ধরনের উচ্চাবিলাস মাত্র। ব্যক্তির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সার্বিকভাবে সিস্টেমের খুব বেশি পরিবর্তন সাধিত হয় না। তবে ব্যক্তির সদিচ্ছা, সততা, দক্ষতা প্রভৃতি তাঁর কর্মক্ষেত্রকে কিছুটা প্রভাবিত করে। আর এই জায়গায়ই নতুন মহাপরিচালক নিয়ে বোদ্ধা মহলে এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়। স্বাস্থ্য বিভাগে অনিয়ম ও পরিকল্পনাহীনতার যে বড় জাল তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনে, সেটি দূর করতে মূলত রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা একা অধিদপ্তর কিংবা মহাপরিচালক পরিচালনা করেন না। তাঁকে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় সহ সরকারের আরও বহু মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী ও সরকার প্রধানের উপর নির্ভর করতে হয়। সর্বোপরি প্রয়োজন পড়ে একটি সুবিন্যস্ত স্বাস্থ্যনীতির। এইসব কিছু সমন্বয় করে স্বাস্থ্য খাতকে গণমুখী করা হিমালয়ের চূড়া ডিঙানোর মতই কঠিন কাজ বৈকি। তাই নতুন মহাপরিচালক ডা. খোরশিদ আলমকে নিয়ে খুব বেশি উচ্চাশা পোষণের প্রয়োজন নেই। বরং আমরা খুশি হব যদি তিনি নিজের সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এই খাতে পরিমাণগত কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করতে পারেন।
বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে এখন যে ব্যবস্থা চালু আছে সেখানে প্রচুর গলদ রয়েছে। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সেবা সক্ষমতা একেবারেই না থাকার মত। ছোটখাট রোগের চিকিৎসা করতে এইসব হাসপাতাল হিমসিম খায়। একটু জটিল হলে সেখানে ন্যূনতম চিকিৎসা পাওয়ার উপায় নেই। ফলে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোকে রোগীর অত্যধিক চাপ সামলাতে হয়। রয়েছে চিকিৎসক ও নার্স সংকট ও তাঁদের সেবামূলক মানসিকতার অভাব। এইসব জায়গায় উন্নতি করতে হলে একটি ভাল স্বাস্থ্যনীতি ও মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজন। এই কাজে মহাপরিচালক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন কিন্তু শেষ বা শুরু করতে হবে সরকারকে। নতুন মহাপরিচালক যদি একটি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি চালু করা নিয়ে কাজ শুরু করেন তাহলে তিনি প্রশংসিত হবেন।
দুর্নীতি একটি সিস্টেমের আওতাধীন উপসর্গ মাত্র। আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য সিস্টেম এমনকি জাতীয় অভিলক্ষ্যও দুর্নীতিকে লালন করে। স্বাস্থ্য খাতের বিস্তৃত দুর্নীতি দূর করতে হলে সিস্টেমের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে যেটি মহাপরিচালকের একক কর্তৃত্বাধীন নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতক্ষণ দুর্নীতি দূর করতে স্থির প্রতিজ্ঞ না হবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ছোটখাটো সংস্কার ছাড়া বড় আকারের পরিবর্তন আসবে না। আমরা আশা করব করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের যে দুর্বলতাগুলো সামনে এসেছে এখন সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সরকার দৃঢ় মনোভাব দেখাবেন এবং নতুন মহাপরিচালককে ওই লক্ষ্য অর্জনে কর্মমুখী করে রাখবেন।