নদীর খোলা চিঠি-‘আমি আপনার কাছে পড়ব জানার জন্য’

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার,
স্যার, আমি ৮ম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। আমি নদী পুরো নাম সেঁজুতি তালুকদার নদী। তবে বর্তমানে আমি নিজেকে রাশা মনে করছি। তার কারণটা হলো রাশার গ্রামের স্কুলে বিখ্যাত বা অনেক বড় মাপের ব্যক্তিরা আসবেন বলে তাদের স্কুল সুন্দরভাবে সাজানো হয়। তাদেরকে বলে দেয়া হয় যে, তারা যেন পরিপাটি হয়ে স্কুলে আসে। স্যার, আপনি অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। আপনি আমাদের স্কুলে আসবেন। এটা আমাদের সবার জন্য অবিস্মরণীয় দিন। আমাদের সমাবেশে বলা হয়েছে আমরা যেন ওইদিন পরিপাটি হয়ে স্কুলে আসি। স্যার জানেন আপনাকে নিয়ে আমি এতদিন অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম আপনি আসবেন বলে। হঠাৎ করে বাস্তবে ফিরে এসেছি। যে বাস্তব অনেক কঠিন, যে বাস্তব গ্রহণ করা যায় না। আসলে স্যার আপনাকে আদর্শ মানি তো তার জন্য হয়তো এই কষ্টটা গ্রহণ করা যায় না বা যাচ্ছে না। এই কষ্টটা কী বা বাস্তবতাটা কী জানেন স্যার?   এই বাস্তবতাটা হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম যে আপনি আস্লে আপনার সাথে অনেক কথা বলব এবং আপনাকে নিয়ে আমার অনুভূতির কথা জানাব। কিন্তু আপনার সময় অনেক কম যার কারণে আমি কিছু বলতে পারব না। আমি এই কঠিন বাস্তবতাটা মেনে নিয়েছি। তাই এই চিঠিটা লিখছি।
আপনার সম্পর্কে আমার অনুভূতিগুলো লিখে বা মুখে বলা কখনো সম্ভব নয়। তারপরও কিছু কথা লিখছি (যদিও আমি জানি না যে আপনাকে এ চিঠিটা দিতে পারব কি না। কারণ আর কখনও আপনার সাথে দেখা হবে কি না ঠিক নেই।)
স্যার আমি যখন ক্লাশ ফাইভে পড়ি তখন আমার ছোট মাসি বলেন যে, যখন সকালে উনারা সাস্টে হাঁটতে বের হন তখন নাকি মাঝেমধ্যে আপনাকে দেখেন। তাই আমি ডিসেম্বরে যখন ওখানে যাই তখন ভোর ৪.৩০ এ উঠতাম (জীবনে কখনও উঠি নাই শুধু আপনাকে দেখার জন্য উঠেছি)। চোখে ঘুম লেগে থাকত, প্রচণ্ড শীত লাগত। বাইরে কুয়াশা পড়ত তারপরও আপনার জন্য উঠতাম এবং হাঁটতে বের হতাম। যখন শাবিপ্রবির ভিতরে পৌঁছাতাম তখন প্রত্যেকটা মুহূর্ত প্রতিক্ষায় থাকতাম কখন আপনার সাথে দেখা হয় তার জন্য। আমার দুর্ভাগ্য যে আপনার সাথে আমার দেখা হয় নাই। তারপর ৭ম শ্রেণিতে ন্যাশনাল হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় আপনাকে বাস্তবে প্রথম দেখি। ওই সময়টা আমি স্বপ্নে ছিলাম। এপিজে আবুল কালাম এর মতে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা। ওই সময়টুকুতে আমার এটা মনে হয়নি যে কালকের পড়া বাকি রয়েছে, না পারলে স্যার বকবেন। স্যার আপনি আমার প্রিয় আদর্শ, ব্যক্তিত্ব ও মানুষ। বাংলাদেশ প্রতিদিনে আপনার লেখা গত মাস থেকে আমি পড়া শুরু করেছি। আমি অপেক্ষায় থাকি আপনার লিখার জন্য। আপনার অনেক বই আমি পড়েছি। তপু বইটি আমার খুব প্রিয়। স্যার আপনার আমার বন্ধু রাশেদ পড়ে আমি মুক্তিযুদ্ধ বুঝেছি। আপনার বৃষ্টির ঠিকানা পড়ে বাবাকে অন্যভাবে জেনেছি। আমার বাবার জন্মদিনে এই বইটা উপহার দেই। মা দিবসে মা কে দেই রাশা।
স্যার আপনার কারণে আমি নিজেকে গোয়েন্দা ভাবতে পেরেছি। কারণ যখন আমি ফেলুদা বা ব্যোমকেশ পড়ি তখন নিজেকে তোপসে কিংবা অজিত ভাবি, কখনও নিজেকে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ ভাবতে পারি না। আর কেন এটা মনে হয় তাও জানি না। কিন্তু যখন আপনার ‘হাত কাটা রবিন’ বইটা পড়লাম তখন নিজেকে গোয়েন্দা মনে হয়েছিল। আসলে স্যার আপনার বইগুলো পড়া মানেই নিজেকে বিভিন্ন চরিত্রে স্থাপন করা, আর যখনই নিজেকে এই চরিত্রগুলোতে স্থাপন করি তখন নিজেই যেন এক অপূর্ব জগতে চলে যাই। যে জগতে শুধুই আনন্দ, নেই কোন পড়াশোনার চাপ। আমার ছোট ভাই কাব্য কখনও পাঠ্য বইয়ের বাইরে কোন বই পড়ত না। গত বছর পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা শেষে তাকে আমি তপু বইটি দেই। সে মনোযোগ দিয়ে বইটি পড়ে এবং বলে যে এত সুন্দর বই কীভাবে স্যার লিখলেন? তার জন্মদিনে ছোটমাসি তাকে দীপু নম্বর টু বইটি উপহার দেন। কাব্য একদিনেই বইটি পড়ে ফেলে।
স্যার আপনার রাতুলের রাত রাতুলের দিন পড়ে আমি প্রতিবাদ করছি যে, এটা মোটেও বাচ্চাদের বই ছিল না  (যেহেতু আমি বাচ্চা)। স্যার আমি জেএসসি পরীক্ষার্থী। দোয়া করবেন যেন ভাল করে পরীক্ষা দিতে পারি।
স্যার আমিও চাই একদিনে সবগুলো ব্শ্বিবিদ্যালয়ের পরীক্ষা হোক। নাহলে অনেক শাহানার একটি দিন অনেক দিনের সুখ কেড়ে নেয়। কারণ সবার পক্ষে সম্ভব নয় বাংলাদেশের সব জায়গায় গিয়ে পরীক্ষা দেয়া আর সবাই মেধাবীও না  (যেমন আমি)।
স্যার জানেন আপনি প্রতিদিন আমরার কল্পনায় আসেন। আমার কথাগুলোও শুনেন। আমি আপনার প্রকৃত ছাত্রী হতে চাই। আমি অনেক আশাবাদী যে একদিন আপনি আমাকে পড়াবেন। তবে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করার জন্য আমি আপনার কাছে পড়ব না। আমি আপনার কাছে পড়ব জানার জন্য। আপনি আমাকে মানুষের মত মানুষ হওয়ার জন্য বলবেন। স্যার ভালো থাকবেন। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি ভালো মানুষ হই। (দুঃখিত স্যার কারণ আমি ভালো করে চিঠিটা লিখি নাই। আসলে আমার পরীক্ষা চলছে তাই সুন্দর করে লিখতে পারি নাই। স্যার প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।
স্যার আমার কিছু প্রশ্ন ছিল আপনার কাছে সেগুলো হলো:
(১)    ২+২=৪ এবং ২*২=৪ কিন্তু ৪*২=৮ এবং ৪+২=৬ কেন? এটার কি কোন গাণিতিক ব্যাখ্যা আছে?
(২)     স্যার দীপু নাম্বার টু বইটিতে দীপুর মায়ের চিঠিটা কেন পাঠকদেরকে জানানো হলো না?
(৩)     বৃষ্টির ঠিকানা এবং রাশা এগুলোর মধ্যে কি কোন বাস্তব চরিত্র আছে?
(৪)    স্যার সঙ্গীসাথী পশুপাখি বইটার সবগুলো কাহিনী কি বাস্তব?
(স্যার প্লিজ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিবেন)
ইতি
নদী
নিলয়-১৭২, পূর্ব নতুনপাড়া