নাইন্দার ভাঙনে ভিটাছাড়া ৩০ পরিবার/পুনর্বাসনের দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
নিম্ন আয়ের মানুষ হরিবল দেব। দিনমজুরি করে কোনো রকমে চলে সংসার। দুই সন্তান, স্ত্রীসহ চার জনের সুখি পরিবার এই মানুষটির। এই সুখের সংসারটাই পড়তে যাচ্ছে আজন্ম দুঃখে। পাঁচ পুরুষের ভিটা-মাটিতে অনেক দূরে শেকড় মেলেছিলেন তিনি। সে শেকড়েই টান মেরেছে সর্বনাশা নদী। নদীগর্ভে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে তাঁর বসতঘর। যেখানে বাস ছিলো তাঁর পাঁচপুরুষের, আজ সে ভিটাহারা নদীভাঙনের করালগ্রাসে। আশ্রয় নিয়েছেন সদরপুরের ভাগ্নে ভক্ত দাসের বাড়িতে। এ গল্প শুধু হরিবল দেব এর পরিবারের নয়। ভয়াবহ বন্যার পর নদী ভাঙার আগ্রাসনে বাড়ি ছেড়েছেন এই গ্রামের নারায়ণ দেব, আনোয়ার হোসেন, ঈসমাইল উদ্দিন ও প্রদীপ দেবও। তাঁরাও আশ্রিত আছেন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। দুইপাড়ে এখনো ভাঙছে নদী। আতঙ্কে আছেন নদীর পাড়ে বসত করা প্রায় ২৫ পরিবারের শতাধিক মানুষ। তারাও অপেক্ষা করছেন বাড়ি ছাড়ার।
নদীতে বসতভিটা ভেঙে যাওয়ার এ কষ্টের গল্প জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের পুরানবাড়ির। অনেকে এই পাড়াকে গাঙেরহাটি (নদীর পাড়ের হাটি) বলেও চিনেন। মহাসিং নদী থেকে নাইন্দা নদী নাম ধারণ করে কামরূপদলং হয়ে সদরপুরে মিশেছে খর¯্রােতা এই নদী। নদী বলতে সদরপুরের বড়খাল। নাইন্দা নদীর শাখা। সদরপুরের সেতু যে নদীর উপর দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে সুনামগঞ্জ-সিলেট মহাসড়ককে। এটি নাইন্দা নদী নামেও পরিচিত। ভাঙন ধরেছে সেতুর বিভিন্ন অংশেও। কিছুদিন আগে সেতুর পশ্চিমাংশ থেকে মাটি সরে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়েছিলো সুনামগঞ্জের সাথে সারাদেশের। সড়ক ও জনপথের চেষ্টায় অস্থায়ী ব্যবস্থায় কোনভাবে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
সদরপুর গ্রামের নদীঘেঁষা পাড়াগুলোর দুঃখের নাম এখন সদরপুর বড়খাল বা নাইন্দা নদী। সদরপুর সেতুর দক্ষিণ পাশের পশ্চিমপাড় পুরোটাই গিলে খেয়েছে ভাঙন। নিঃস্ব করেছে অনেক কৃষককেও। এখন টান মেরেছে গাঙেরহাটিতে। আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন দুইপাড়ের শতাধিক পরিবার।
নদী ভাঙনের কষ্টে পড়া পরিবারের সদস্যরা জানান, শতবছর ধরে তাদের পূর্ব পুরুষেরা এই নদীর পাড়ে বসতি করেছিলেন। এখন নদী তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬ পরিবারের ভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতিদিনই নদী ভাঙছে। ভয়াবহন বন্যার পর নদী ভাঙন বেড়েছে। এখন নদীতে পানি আছে, যখন পানি কমতে শুরু হবে, পাড় আরো বেশি ভাঙবে।
স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের এ দুঃখ দুর্দশা দেখতেও যাননি। তারা দাবি করেন, যেহেতু তাদের থাকার মতো ভিটেমাটি নেই। তাদেরকে সরকারি তত্বাবধানে পুনর্বাসন করা হোক।
গ্রামের ঝাঁনকি বিশ্বাস ও আউয়াল মিয়া জানালেন, তাঁদের পূর্ব পুরুষের এখানে বড় হয়েছে, মৃত্যুবরণ করেছেন। সন্তানেরা নদীর সাথে মিতালী করে বেড়ে উঠেছে। সর্বনাশা নদী এখন তাদের গিলে ফেলছে। কোথায় যাবেন সে চিন্তাই এখন তাঁদের মাথায়। পুনর্বাসন চান তারা।
পার্শ্ববর্তী কামরূপদলং গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি আবদুল হক বলেন, আমার বয়সে এতো ভাঙন আগে দেখি নি। সম্প্রতি খুব বেশি পাড় ভাঙছে। এখন তো নদীতে পানি বেশি। পানি কমতি শুরু হলেই ‘দফলা’ ‘দফলা’ (বড় বড় চাকা) ভেঙে পড়বে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আশিক মিয়া একই ধরণের মন্তব্য করলেন। তিনি বলেন, নদী ভাঙনে ৫-৬ পরিবার বসতভিটা ছেড়েছে। বাকীরাও থাকতে পারবেন না। তাদের সকলেরই পুনর্বাসন জরুরি।
গাঙেরহাটিরই বাসিন্দা শান্তিগঞ্জ উদীচীর সভাপতি শ্যামল দেব। তাঁর বসতঘরও ভাঙনের মূখে। পূর্ব পুরুষের ভিটা-মাটি ছেড়ে দু’চারদিনের মধ্যে তাকে বাড়ি ছাড়তে হবে জানিয়ে শ্যামল দেব বললেন, আমাদের পাঁচ পুরুষ এখানে জীবন কাটিয়েছেন। নাইন্দা নদীর জলে-খেলে আমাদের বেড়ে উঠা। এখানে আমাদের এক একরের চেয়ে বড় বাড়ি ছিলো। শুধু আমাদের নয়, অন্যদেরও বড় বড় বাড়ি ছিলো। ভাঙতে ভাঙতে আমরা ভিটাহারা। ৩০ পরিবার উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সবাই। যে যেদিকে পারছেন আশ্রয় নিচ্ছেন।
শ্যামল দেব বললেন, স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাড়া অন্য কোনো রাজনীতিবিদ, পাউবো বা প্রশাসনের কেউ নদীভাঙন এলাকাটি পরিদর্শন করেন নি।
শনিবার শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান প্রভাষক নূর হোসেন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বললেন, বন্যা পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। পরে স্থানীয় মুরব্বিদের মাধ্যমে ভাঙনের বিষয়টি জেনেছি। অত্যন্ত দুঃখজনক। আপাতত তারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয় এলাকায় আসার পরে মুরব্বিদের নিয়ে তাঁর (মন্ত্রী মহোদয়ের) সাথে কথা বলে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান বললেন, ভাঙনের বিষয়টি আমি জানি। স্থানীয় ইউপি সদস্য ও আমাদের একজন কর্মকর্তাকে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করিয়েছি। আগামী এক দুই সপ্তাহের মধ্যে তারা কিছু টাকা হয়তো পাবেন। আমি ওখানে যাব। সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এদিকে ভয়াবহ বন্যার পর নদীর পানির কমতে শুরু হতেই সুরমা নদীর ভাঙনে জেলার দোয়ারাবাজার, আমবাড়ি, হরিণাপাটি, সুনামগঞ্জ সদরের কিছু অংশ, কুশিয়ারার ভাঙনে ফয়জুল্লাপুর, প্রতাপপুর, বাঘময়না, ফেচীরবাজারসহ বেশ কিছু এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হয়েছে জানালেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (২) শামছুদ্দোহা জানালেন, নদীর পানি এখনো টইটুম্বুর। পানি যতই কমবে, ভাঙনও বাড়বে। সদরপুরের খাল বা নাইন্দা নদীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদী সংরক্ষণের কোন প্রকল্প নেই। সরেজমিনে এলাকাটি দেখে ওখানে কোন প্রকল্প গ্রহণ করা যায় কি না বিবেচনা করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহরুল ইসলাম বললেন, নদী খননের জন্য সমীক্ষা চলছে। ওই সময় নদী সংরক্ষণের বিষয়টি ওঠে আসবে। সমীক্ষা শেষে প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হবে, প্রকল্প অনুমোদন হলে কাজ বাস্তবায়ন শুরু হবে।