নাগরিকের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক

রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু
স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছর শাসন করে গেল। অত্যাচার নির্যাতন, বিভিন্ন কালাকানুন দিয়ে দাবিয়ে রেখে লন্ঠন করে ছিল। এর বিরুদ্ধে এ উপমহাদেশে কত কত দেশ প্রেমিক কে প্রাণ দিতে হয়েছে, নির্যাতন হতে হয়েছে।
পাকিস্তানীরা একই ভাবে উপনিবেশ তৈরি করে বাঙ্গালী জাতিকে ২৩টি বছর শাসন শোষন, নির্যাতনের মাধ্যমে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল। পাকিস্তানী শাসকরা দ্বি-জাতি তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপরে আঘাত হেনেছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন, ষাটের দশকের দাঙ্গা, ১৯৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান একের পর এক আন্দোলন করে গেছে বাঙ্গালী জাতি। ’৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আমাদের অধিকার পেলাম। ১৯৭২ সনে গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে আমরা আমাদের মৌলিক অধিকার এর নিশ্চয়তা পেলাম।
ষাটের দশকে আইয়ূব- মোনায়েমের শাসনের আমলে যে নিপিড়ন ও কালাকানুনের অপপ্রয়োগ ঘটেছিল তার তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সনের ৪ঠা নভেম্বর সংবিধানের প্রথম অধ্যায়টি ছিল মৌলিক অধিকার। যার প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে “এই ভাগের বিধানাবলির সহিত অসামঞ্জস্য সকল প্রচলিত সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।” তাই তখন ব্রিটিশের গড়া ‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ বাতিল হয়ে গেছে।
‘অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এইদুটু নির্যাতন মূলক আইন ৩৯ ধারা নিষ্ক্রিয় ও নির্জীব করে দিয়েছে। আমাদের সংবিধানের ৩৯ ধারায় গণতন্ত্রের কথা বলা আছে যা আমাদের ভিত্তি। যা জনগণের চিন্তা ও স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে।
২০১৩ সাল থেকে আইসিটি অ্যাক্ট বিশেষ করে ৫৭ ধারা ব্যবহৃত হয়ে ২০১৮ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট শুরু হয়। এতে দেশের নাগরিকদের মত প্রকাশের অধিকার সংকোচিত হয়। রিপোটার্স ইউনিট বর্ডাসের হিসেব মতে ২০২০ সালের ১৮০ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২ তে এবং তা আগের বছরের তুলনায় পিছিয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত হয়েছেন রাজনীতিক এবং সাংবাদিকরা। এ আইনের অজামিনযোগ্য ধারাগুলোই ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে পছন্দ। কারণ বিচার পাওয়ার আগেই মাসের পর মাস জেল খাটানোর এরচেয়ে ভালো উপায় আপাতত আর নেই।
কোভিড ১৯ এর মহামারিতে অর্থনৈতিক দূরাবস্থার মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও দুর্নীতির ব্যাপারে তথ্য প্রকাশ করায় অনেকের বিরুদ্ধে জিডিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। ১৭ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে প্রথম আলোর জৈষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে ছয় ঘন্টা আটক রেখে হেনস্তা ও নির্যাতন করা হয়। রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৮ মে ঢাকায় চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রট আদালতে হাজির করা হয়। ছয় দিন পর জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসেন। রোজিনা ইসলাম অনেকদিন যাবৎ অনুসন্দানী সাংবাদিক হিসেবে প্রথম আলোতে কাজ করে আসছেন। এর জন্য তিনি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে পুরষ্কৃত হয়েছেন। করোনা ১৯ মহামারির শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ আমলা ও তাদের অপকর্মের তথ্যসহ তার লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যার জন্য বিক্ষুব্দ আমলা কর্মকর্তা কর্মচারিরা অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মোঠো ফোন কেড়ে নিয়ে ৬ ঘন্টা আটক রেখে হেনস্তা ও নির্যাতন করেন।
যে সাংবাদিক বহু বছর ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেছেন, তাকে পেশাদারি কর্তব্য পালনের সময় আটকে রাখা, কারাগারে পাঠানো সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরোটলারেন্স’ বার্তার বিপক্ষে একটি অবস্থান। এই সাংবাদিককে সরকারের উচিত মামলার বদলে পুরষ্কার প্রদান করা।
বাংলাদেশে গত ৫০ বছরে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন তারা দাবি করেন যে দেশে মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা আছে। এমনকি আগের চেয়ে অনেক বেশি। একটি দেশে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচিত হলেই সেখানে গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ থেকে বঞ্চিত হয়। রোজিনা ইসলামের সঙ্গে যা ঘটেছে তা স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের স্বার্থে আঘাত লাগায় তার আক্রোশ থেকেই ঘটেছে।
বঙ্গবন্ধু ও বাঙ্গালী জাতির যে স্বপ্ন একটি গণতান্ত্রিক, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচারের বাংলাদেশের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের ফসল হলেও, কখনো সমাজকে সে আদর্শকে ঢেলে সাজানো যায়নি। সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও বাধ্য বাধ্যকতা থাকলেও রাষ্ট্র তেমন ভাবে চলতে পারেনি।
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হল- জনকল্যাণ করা। তা’ আশু এবং দীর্ঘ মেয়াদি উভয় কল্যাণই লক্ষ্য। আজকাল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির অভাব হয়না। কিন্তু দেখা যায় নেতারা ক্ষমতায় যাওয়ায় পর আমলাতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে জনগণের নিকট প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। যার ফলে আমলাতন্ত্রের শক্তি বেড়ে যায় এবং গণতন্ত্রের সংকোচন বাড়তে থাকে আইনের শাসন সংকট তৈরি হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন বাড়তে থাকে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির সম্মূখিন হয়। ফলে দুর্নীতি ও ক্ষমতার দাপট বাড়তে থাকে।
সত্যিকার রাজনীতিবিদরা আপসের রাজনীতি বা ক্ষমতার রাজনীতি করেন না। বঙ্গবন্ধু করেছেন জনতার রাজনীতি। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, মুক্ত চিন্তার অধিকার, তথ্য জানার অধিকার গড়ে তুলতে হবে। তথ্য জানার অধিকার আইনের যত বিস্তার হবে ততই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ৫৭ ধারা, অফিসিয়াল সিক্রেটস আইন তত সংকোচিত হবে। জনগণের নিকট যত জবাবদিহিতা বাড়বে ততই দুর্নীতি লুটপাত কমতে থাকবে। আশা করি নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করতে সরকার আরও উদ্যোগী ভূমিকা রাখবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।