সজীব দে
একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী বিচারে ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে গণআদালত বসেছিল, তার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায়ও তিনি সাক্ষ্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ নির্মিত ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’র নামকরণও করেন সালেহ চৌধুরী।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭ টায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুনাগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আয়োজনে প্রখ্যাত সাংবাদিক, খ্যাতনামা লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরীর নাগরিক শোকসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বক্তারা বলেন, সালেহ চৌধুরী একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, সাংবাদিক, কলাম লেখক ছিলেন। এক ব্যক্তির চরিত্রে এত গুণের সমাহার সচরাচর দেখা যায় না।
এছাড়া তিনি ছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলন, ১৯৯২ সালের ‘গণ আদালতে’র অন্যতম সাক্ষী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার সাক্ষী।
দায়িত্ব পালন করেছেন কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ও দাবা ফেডারেশেনের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবেও। দেশসেরা দাবারু নিয়াজ মোর্শেদের মেন্টর ছিলেন তিনি।
বক্তারা বলেন, সালেহ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি ভালো মনের মানুষ ছিলেন। অহংকার ছিল না, আত্মপ্রচারও তিনি করতেন না। আমাদের জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সহ জেলার অনেকগুলো শহীদ মিনারের আর্কিটেক্ট ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। হুমায়ুন আহমেদ তাঁকে নানাজি হিসেবে ডাকতেন। যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য তাঁর উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আগুনের পরশমনি ছবির গেটাপ, পোশাক, মুক্তিযোদ্ধাদের আচরণ নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ তাঁর সাথে আলোচনা করতেন।
বক্তারা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে পাঠাগার ও সংগ্রহশালায় মুক্তিযোদ্ধাদের বই ও স্মৃতি ধরে রাখার আহবান জানান।
শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ডের আহবায়ক মো. সাবিরুল ইসলাম। শোকসভার পূর্বে প্রয়াত সালেহ চৌধুরীর স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
নাগরিক শোকসভায় দিরাই-শাল্লা আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা বলেন, যখনই আওয়ামী লীগ ব্যতিত অন্য দল ক্ষমতায় এসেছে তখনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগ্রতিশীল রাজনৈতিক পরিবারে নেমে এসেছে দুর্যোগ। তবে আমি এ ধরনের অবস্থার সম্মুখিন হইনি। কারণ বটবৃক্ষের মতো আমার পরিবারের পাশে ছিলেন সালেহ চৌধুরী। কি শূন্যতা আজ আমি অনুভব করছি তা বলবার নয়। এসময় তিনি প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী স্মরণে নানা উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান।
শোকসভায় প্রয়াত সালেহ চৌধুরীর বড় ছেলে ওবায়েদ আজমান চৌধুরী বলেন, বাবা আমাদের পার সৎভাবে জীবন যাপন করতে বলতেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই নাগরিক শোকসভার আয়োজন করায় তিনি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
জেলা উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় শোকসভায় বক্তব্য রাখেন, দিরাই শাল্লা আসনের সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা, ছাতক-দোয়ারাবাজার আসনের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সুনামগঞ্জ মৌলভীবাজার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শামসুন্নাহার বেগম শাহানা রব্বানী, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির ইমন, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি অ্যাড. আপ্তাব উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. আব্দুল মজিদ সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট হোসেন তওফিক চৌধুরী, শিক্ষাবিদ পরিমল কান্তি দে, অ্যাড. হুমায়ুন মঞ্জুর চৌধুরী, জেলা উদীচীর সভাপতি শীলা রায়, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক, মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের আহবায়ক অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা আলী আমজাদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার নূরুল মোমেন, মুক্তিযোদ্ধা আতম সালেহ, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাসিম, মুক্তিযোদ্ধা আবু সফিয়ান, নাট্যকার ও নাট্যাভিনেতা ফজলুল কবির তুহিন, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সম্পাদক পংকজ কান্তি দে, দৈনিক জনকন্ঠের জেলা প্রতিনিধি এমরানুল হক চৌধুরী, দৈনিক কালের কন্ঠের জেলা প্রতিনিধি শামস শামীম, । এছাড়াও নাগরিক শোক সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রয়াত সালেহ চৌধুরীর পরিবারবর্গ।


