স্বপন কুমার দেব
১. এ ধরণের শিরোনামের বাতাবরণে বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করা যায়। ব্যক্ত করা যায় মতামত, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি। টেনে আনা যায় রাজনীতি, শাসন, আইন-কানুন, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সুখ-দু:খ, প্রেম-ভালোবাসা-বিচ্ছেদ, চলতি ঘটনা সহ অনেক কিছু। বলা যায় একের ভেতরে অগুণিত কথা ও কাহিনী। সম্প্রতি অনেক ঘটনা ও দু:খ-শোকের কাহিনী অনবরত ঘটে চলেছে আমাদের প্রিয় পৃথিবী নামের গ্রহটিতে। নতুন বিশ্বযুদ্ধ শুরু না হলেও খন্ডযুদ্ধ ভয়াবহ আকারে চলছে। দেশে দেশে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাস এখন প্রধান ইস্যু। বিভিন্ন ধরণের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে আকাশের নীল রং ধূমায়িত হয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেছে। গুপ্ত হত্যায় সবাই কমবেশী আতংকিত। অনবরত জল ঘোলা হচ্ছে। ঘোলা জলে মৎস্য বা মাছ শিকার অতি পুরাতন একটি প্রবাদ বাক্য। তেমনি মাছের বাজার দখল করেছে চাষের মাছ। হারিয়ে যাচ্ছে খাল, বিল, হাওড় আর নদীর সুস্বাদু প্রাকৃতিক মাছের সমাহার। কিছু পাওয়া গেলেও তার যে মূল্য তা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। তবুও চাষের মাছ থাকায় মাছ পাতে পড়ছে। না হলে মাছে ভাতে বাঙালি বিশেষণ থেকে মাছ শব্দটি বিদায় নিতো। তবে চাষের মাছের মূল্যও ক্রমশ: বাড়ছে। মাছের নিয়ন্ত্রণ আর জেলেদের হাতে নেই। মৎস্য মারিব খাইব সুখে এ কথাগুলি বিলুপ্ত প্রায়। খাল, বিল, হাওড়, নদী সবই ভরাট আর বেদখলের থাবায় আক্রান্ত। প্রাকৃতিক মাছ আসবে কোথা থেকে? তবে সবজি উৎপাদ প্রচুর পরিমাণে হলেও মূল্যের লাগাম নেই। মাংসের বাজারও তদ্রুপ। দেশী মুরগী বলে এখন আর কিছু নেই। ছোটদের কাছে খাঁটি দুধের স্বাদ এখন বিস্বাদ লাগে। তেমনি অবস্থা দেশী মুরগীর। খাঁটি বলে কিছু যেন থাকতে নেই। বিদেশী মুরগী বলে যেগুলি বিক্রি হয় সেগুলি সন্দেহজনক। তেমনি ডিমের অবস্থা। অনেক বছর আগে সুনামগঞ্জের বাজারে সবজি মিলতো না। ফুলকপি ছিল অধরা। কেউ সিলেট গেলে পরিবারের জন্য ফুলকপি নিয়ে আসতেন। নিজেরা ও পাড়া প্রতিবেশীরা মিলে মহার্ঘ্য সেই ফুলকপির স্বাদ নেয়া হতো। সুনামগঞ্জে সবজিতে বিপ্লব এনেছেন নদীর ওপাড়ের মানুষেরা, বিশেষত: যারা বাইরের জেলা থেকে এসেছিলেন। এখন বাজারে থরে থরে বিভিন্ন ধরণের সবজি বা আনাজপাতি শোভা পায়। এমন কি বাইরেও চালান হয়। যাই হোক এর মধ্যেও সবজি বাজারে মূল্যের উঠানামা আছে। আমাদের ছোট বেলায় পঞ্চাশের দশকের শেষ ভাগ থেকে ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, এমনকি এর পরেও অনেকদিন পর্যন্ত সবাই মাছ বাজারে যেতেন খালি হাতে। খালি হাতে মানে পকেট খালি নয়। তখন হাতে কোন থলে বা ব্যাগ বহন করার প্রচলন ছিল না। রুই, চিতল, আইড় ইত্যাদি বড় মাছ আস্ত বিক্রি হতো না। কেটে মুড়া সহ বিভিন্ন অংশ পিস্, পিস্ করে বিক্রি-বাটা হতো। ক্রেতারা পছন্দ মতো টুকরো বা মুড়া কিনে নিতেন। সব ধরণের মাছই জালি বেতের ছিলায় গেঁথে ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিলে তিনি তা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বাসায় ফিরতেন। ফেরার সময় যার সঙ্গেই দেখা হতো তিনি জানতে চাইতেন মাছের দাম কতো হলো? উত্তর দিতে দিতে বিরক্তি। অনেকে দাম কমিয়ে বা বাড়িয়ে বলে দিতেন। বাজার এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা মাছ কেনার জন্য ‘খলই’ (বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরী এক ধরণের মাছ রাখার পাত্র যা প্রতিটি বাসায়ই রাখা হতো) ঝুলিয়ে মাছ বাজারে যেতেন। যাই হোক সেই সব দিন আর নেই। বর্তমান অবস্থা সবারই জানা।
২. সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না হাত ধরাধরি করে চলে। একটির পর আরেকটি আসে। বিশ্বে এটিই নিয়ম। তবে বেশ কিছুকাল যাবৎ লক্ষ্য করা যাচ্ছে দু:খ-বেদনা-কান্না ইত্যাদির স্থায়িত্বকাল অনেক বেশী। কমে যাচ্ছে হাসি-আনন্দ আর সুখের সময়কাল। অনবরত সংবাদ প্রবাহ বয়ে আনছে সব মন খারাপের খবর। শিশুদের সম্পর্কে খারাপ খবরে মন অধিক খারাপ হয়। শিশুরা নির্মল ও পবিত্র। শিশুদের সংস্পর্শে গেলে মনে আনন্দধারা প্রবাহিত হয়। সেই সব দেবশিশুদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন ক্রমশ: বেড়েই চলেছে। এমনকি মায়ের হাতেও শিশু হত্যা হয়। বর্তমান বিশ্বে কম বেশি নিরাপত্তা হীনতায় আছে শিশুরা। সম্প্রতি দু’বছরের একটি শিশুকে লেকের পাড় থেকে টেনে নিয়ে গেল কুমির। অত:পর সেই শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। অবুঝ নিরপরাধ শিশু। শিশুদের বা বাচ্চাদের কাছে পশুপাখি, জীবজন্তু অনেক আদরণীয়। বাঘমামা, সিংহমামা, ককো ইত্যাদি অনেক আদরের ডাকে তারা পশু কূলকে সম্বোধন করে থাকে। কুমির কর্তৃক শিশুটিকে টেনে নেয়ার মুহূর্তটিকেও সেই হতভাগ্য শিশু হয়তো খেলা বলেই ভেবেছিল। আমেরিকার ফ্লোরিডায় ডিজ্নি রিসোর্টের লেক বা জলাশয়ের পাড়ে ঘটনাটি ঘটেছে। হায়রে কুমীর। তার ও তো বুঝি ভালোবাসা বুঝার ক্ষমতা নেই। কিন্তু সেই যে গল্পে আছে এক শেয়াল প-িতের কাছে কুমীর তার অনেকগুলি ছানা লেখাপড়া শিখতে জমা দিয়েছিল, আর শেয়াল প্রতিদিন একটি করে কুমীর ছানা খেতো। এভাবে শেয়ালটি, ছানা খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটি ছানাকেই মা কুমীরকে দেখিয়ে বুঝাতো সাতটি ছানাই তার কাছে মনের আনন্দে সুস্থ শরীরে বহাল তবিয়তে থেকে লেখাপড়া শিখছে। অত:পর যে দিন শেষ ছানাটি শেষ হয়, শেয়াল তখন পালিয়ে যায়। কুমীর চালাকি বুঝতে পেরে ঘাপ্টি মেরে বসে থেকে একদিন শেয়ালের ঠ্যাং কামড়ে ধরে ফেলে। শেয়াল অতি কৌশলে লাঠি ধরেছ বলে কুমীরকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যায়। ধূর্ত শেয়ালের কাছে কুমীর পরাজিত হয়। কুমীর তো শিশুদের ভাষা বুঝে, তাহলে কেন এমন করলো! জানি না। প্রসঙ্গত মনে পড়ে কয়েক বছর আগে শীতের দিনে সুন্দরবনে খালের ভেতর দিয়ে ইঞ্জিন বোটে দু’ দিকের বনরাজি দেখতে-দেখতে যাচ্ছিলাম। সামনে পেছনে অনেক বোট্। এমন সময় খালের পাড়ে এক বিশাল আকৃতির কুমীর কে দেখা গেলো মটকা মেরে অলস ভাবে শুয়ে থেকে রোদ পোহাচ্ছে। এমন সময় পেছন থেকে একদল শিশু বোঝাই একটি বোট্ একেবারে সামনে এসে একদিকে কাত হয়ে যায়। কুমীরকে দেখে শিশুর দল আনন্দে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠে ‘ক্রকোডাইল’ ‘ক্রকোডাইল’। আমার কাছে মনে হলো মনে হলো কুমীর যেন চোখ ঘুরিয়ে একটু সাড়া দিল ও সখ্যতা দেখালো। বিপদজনক মনে হলেও দৃশ্যটি ছিলো মধুর। এবারে কুমীর কর্তৃক শিশু গিলে নেয়ার ঘটনা থেকে কুমীরদের প্রতি ধারণাটি পাল্টে গেছে।
৩. বর্তমান সরকারের আমলে দেশের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়ে আসছে, একথা স্বীকার করতেই হবে। চ্যালেঞ্জের মুখে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সেতু যে দিন উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে দুই পাড়কে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করবে সে দিন সাগরের মতো দুরন্ত পদ্মার ঢেউকে হয়তো আর শূন্য হৃদয় নিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কষ্ট বহন করতে হবে না। দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। যদিও এর জটিল হিসেব সাধারণ মানুষ বুঝেন না। উৎপাদন ও আমদানীর কারণে অনেক মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে বিদ্যুৎ। তবুও ঘনঘন লোডশেডিংয়ে ও ভল্টেজ উঠানামা করায় জনজীবনে যথেষ্ট ভোগান্তি আছে। বলা হয় উৎপাদনের সঙ্গে সঞ্চালন লাইনের সমন্বয় নেই। সেকেলে বিতরণ লাইন আছে আগের জায়গাতেই। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বাড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিশাল অংকের অর্থ চুরিতে সবাই অবাক হয়েছেন। আশাকরি অপরাধীদের শাস্তি হবে এবং চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার হবে। ইতিপূর্বে অনেক ব্যাংক চুরির ঘটনার সুরাহা এখনও হয়নি। অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব এসেছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় এক সময় সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা যেতে সিলেট হয়ে বাস, ট্রেন মিলিয়ে দু’ দিন লাগতো। এখন রাতে রাতে কিংবা দিনে দিনে পৌঁছানো যায়। বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হলেও রাজনীতির বিরোধীরা মাঝে মাঝেই প্রশ্ন তুলছেন। আইন শৃঙ্খলার বিষয়টি ইদানিং বেশ স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। টার্গেট কিলিং নতুন ভাবে সংযোজিত হয়ে আনুপাতিক হিসাবে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বাড়ছে। এমতাবস্থায় পরিসংখ্যান বিভাগ সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে সংখ্যালঘু এবং হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও এর আগের সব আদমশুমারিতে বলা হয়েছে হিন্দু জনসংখ্যা ক্রমশ: নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি, দেব মন্দিরের সম্পত্তি ইত্যাদি দলমত নির্বিশেষে ভূমিখোরদের ও জবরদখলকারীদের লোলুপ দৃষ্টির কোপানলে নানাভাবে সংকুচিত। ভূমি খোর সিন্ডিকেটের দলে সব দলেরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। একবার জমি বেদখল বা বেহাত হয়ে গেলে তা উদ্ধার করা অনেক কঠিন। ভুয়া মালিক, ভুয়া ওয়ারিশ, জালিয়াতি দলিল কাগজপত্র সহজেই তৈরী হয়ে যায়। নতুন হাল আরএস জরীপ আরেক দু:স্বপ্নের মতো। এখানে সবকিছুই হতে পারে। চলমান জরীপ প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তা কর্মচারীদের ধরার উপায় নেই। তাদের অবস্থান সব আইনের উর্ধ্বে। এক সময়ে তহশিলদার, ভূমি অফিস ইত্যাদি নিয়ে জনমনে একটা ভীতি ছিল। বর্তমানে এর স্থান দখল করেছে জরীপ কর্মচারী আর তার কার্যালয়।
৪. আইন শৃঙ্খলার সঙ্গে আসে সুশাসন। এ নিয়ে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অনেক দিকই বর্তমানে পাশাপাশি চলছে। সফলতার দিক থেকে সরকার অবশ্যই প্রশংসা এবং কৃতিত্বের ভাগীদার। তবে মানুষ মনে করে আইন-শৃঙ্খলা, সুশাসন বজায় রাখা তো সরকারের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এ নিয়ে হৈ চৈ করার দরকার নেই। ব্যতয় ঘটলে মানুষ সরব হয়ে ওঠেন। এটাই স্বাভাবিক। জনগণের নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ এবং বিভিন্ন হত্যাকা-ের কূল কিনারা না হওয়া সবাইকে নিরাশ করে। কৃতকার্য্যতার পরিসংখ্যান থেকে অকৃতকার্য্যতার তালিকা বড় করে চোখে ভাসে। বৎসরের পর বৎসর পেরিয়ে যায় কিন্তু সাগর-রুনি হত্যাকা-ের কোন সুরাহা নেই। নেই কোন অগ্রগতি। একের পর এক গুপ্তহত্যা ঘটছে। ধরা পড়ে না অপরাধী। যাও একজনকে জনতা ধরিয়ে দিল সে মরলো ক্রস ফায়ারে। হয়তো অনেক তথ্য রয়ে গেল অনুদ্ঘাটিত। এছাড়া প্রশ্ন আছে অনেক। সোহাগী জাহান তনু’র হত্যাকা- ও ধর্ষন নিয়ে বিরাট এক ধ্রুমজাল সৃষ্টি হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট আর পোষ্টমর্টেম রিপোর্ট নিয়ে ঘটেছে নানা কৌশলী শব্দ চয়ন। যেমন ‘ধর্ষন’ ও ‘যৌন সংসর্গ’। সবাই চায় তনু হত্যাকা- এবং ধর্ষিতা হওয়া বা না হওয়া ইত্যাদি সব রহস্য উদ্ঘাটিত হোক ও অপরাধীর বিচার হোক্। মিতু হত্যায় আসল হত্যাকারী কে? এ নিয়ে স্বামী এসপি বাবুল আক্তারকে ঘিরে আরেক রহস্য জাল সৃষ্টি হয়েছে। এসব রহস্য ভেদ্ হোক। না হলে সাধারণ মানুষের হতাশা যেমন বাড়বে তেমনি আহত হবে তাদের সেন্টিমেন্ট। সবচেয়ে ভংয়কর সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলো গুলশানের একটি হোটেলে। সরাসরি জঙ্গি আক্রমণ। দুই জন পুলিশ অফিসার সহ অনেক জিম্মি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়েছেন জঙ্গিদের হাতে। বাংলাদেশে এধরণের ঘটনা এই প্রথম। অবশেষে সেনাবাহিনীর কমান্ডো আক্রমণে জঙ্গিরা নিহত। কিছু জিম্মি জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। অত:পর পবিত্র ঈদের দিনে শোলাকিয়ায় আবার জঙ্গি হামলা। জঙ্গি দমনে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব প্রভৃতি সশস্ত্র বাহিনীর সফল অভিযান কৃতিত্বের দাবিদার। তবে গোয়েন্দা বিভাগ ও পুলিশ বিভাগকে আরো ক্ষিপ্র থেকে ক্ষিপ্রতর হতে হবে। এখন আর জঙ্গি আছে জঙ্গি নেই এধরণের কথা বলার সুযোগ রইল না। জঙ্গি ঘাঁটি ও জঙ্গিবাদ সমূলে উৎপাটিত হয়ে প্রিয় মাতৃভূমি জঙ্গিমুক্ত হোক।
৫. স্বাস্থ্যসেবা জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলির অন্যতম একটি চাহিদা। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। তবে যে জনবলের উপর কার্যক্রম নির্ভর করছে তাদের যথেষ্ট ত্রুটি এবং গাফিলতি আছে। ফলশ্রুতিতে অনেকটা মান্ধাতার আমলেই আটকে আছে এই পরিসেবা। বিশেষত: হার্ট, কিডনি, লিভার, ক্যান্সার ইত্যাদি জটিল রোগের সুচিকিৎসা মফস্বলে নেই বললেই চলে। রাজধানী ঢাকা শহরে সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা যেমন বিলম্বিত তেমনি নানা তদবির তদারকির উপর নির্ভরশীল। নামকরা পাঁচতারকা বিশিষ্ট প্রাইভেট হাসপাতাল আছে কয়েকটি। তবে এমন খরচসাধ্য যে তা সাধারণ মানুষের বহন ক্ষমতার বাইরে। জটিল রোগে প্রাইভেট হাসপাতালে চলে টেষ্টের পর টেষ্ট। অত:পর মেজর অপারেশন কিংবা সমতুল্য কিছু। এরপর হয়তো বা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। ক্যান্সারের চিকিৎসায় মানুষটিও যেমন গেল তেমনি পরিবারটিও সর্বশান্ত হলো। অনেকে আবার চলে যান ভারত, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, আমেরিকা। তবে তুলনামূলক ভাবে ঢাকা ও বড় বড় শহর কেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাফল্যের সূচক বাড়ছে। এটি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ক্যান্সার এমন এক রোগ যার চিকিৎসায় ফলাফল কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া সব খানেই শূন্য। প্রকৃতপক্ষে ক্যান্সারের ঔষধ এখনও আবিষ্কার হয়নি। মাঝে মাঝে বরঞ্চ হোমিওপ্যাতিতে উপকার পাওয়া যায়।
৬. শিক্ষার অধিকার আরেকটি মৌলিক অধিকার। এ নিয়ে এতবেশি চটকানো চলছে যে, ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সবাই সব সময় তটস্থ হয়ে থাকেন কখন নতুন নিয়ম চালু হলো বলে। একটা নির্দিষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত বিনা খরচে লেখাপড়া করার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে প্রাইমারী পর্যায় পর্যন্ত এটি মোটামুটি সফল। এখানে সরকারের কৃতিত্ব আছে। এর পরবর্তী পর্যায় যথেষ্ট ব্যয়বহুল। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি গাইড বইয়ের দাম তিন হাজার টাকার উপরে। যতই গাইড বর্জনের কথা হউক বাস্তবে গাইড ছাড়া সাধাারণ শিক্ষার্থীদের চলে না। পরবর্তী পর্যায়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং এগুলিতে পাহাড় প্রমাণ খরচ। পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদির বাইরে থেকে যায় বিশাল এক ছাত্র সমাজ। প্রাইভেটে যেতে যাদের সামর্থ্য নেই তাদের কাংখিত স্বপ্ন পূরণের ইতি ঘটে। শিক্ষা নিয়ে ছাত্র সমাজের আন্দোলন অনেক পুরাতন। পদ্ধতির পর পদ্ধতি চালু না করে একটি পদ্ধতি স্থির থেকে স্থিরতর হউক। সব সময় যেন টেনশনে থাকতে না হয়, কখন নতুন নিয়ম আসবে আর সবাইকে তা নিয়ে শংকায় পড়তে হবে। পাশের হার বাড়ছে। বাড়–ক। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে না জ্বললে ফাঁকি থেকেই যাবে।
৭. অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান সমস্যার সমাধান কি হয়ে গেছে? হয়নি। তবে সবাই কিছু না কিছু রোজগার করছেন। মজুরি বেড়েছে। কোন না কোন ভাবে মাথা গুজার ঠাঁই আছে বলে দৃশ্যত: প্রতীয়মান হয়। তবে বাস্তবে গরমিল আছে। সমস্যা রয়ে গেছে গভীরে। পাশাপাশি নগরায়ন, অট্টালিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য চোখ ধাঁধানো রূপ নিয়েছে। মার্কেটের পর মার্কেট। সর্বত্র নগরায়ন দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এমন একদিন হয়তো আসবে যখন সব গ্রামগুলির দৃশ্যপটে সবুজ মুছে গিয়ে ইট পাথরে রূপ নেবে। সর্বত্র পরিকল্পনা ও বিন্যাসের অভাবে ইদানিং যত্রতত্র দোকান মার্কেট গড়ে উঠেছে। এখন লোকে বাড়িঘর বানালে সামনে বানিয়ে নেয় দোকান কোঠা ও কারখানা। এত দোকান চলে কিভাবে! হয়তো ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে মানুষের। এক একটি শহর যেন এক একটি বাজার। আবাসিক এলাকা বলে আর কিছু থাকছে না। সারাদিন বাজারের হৈ চৈ আর নানাবিধ কর্কশ শব্দ। হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ, হারিয়ে যাচ্ছে আলো। বাড়িতে বাড়িতে বাগান গাছপালা ফুল সব যেন বিলুপ্তির পথে। চোখে পড়ে শুধু কাঠ খোট্টা ইমরাতের পাহাড়। দৃষ্টি সীমার আড়ালে চলে যাচ্ছে পাহাড়, নদী, নীল আকাশ। এতসব দূষণের মধ্যে নতুন করে আমরা এখন দৃষ্টি দূষণে ভুগছি। আমরা তো সবুজ দেখতে চাই। দেখতে চাই পাহাড়, নদী, ধানক্ষেত আর আকাশের নীল রঙ।
৮. বিনোদন, সংস্কৃতি এখন মূলত: টিভি, ইন্টারনেট, ফেসবুক নির্ভরশীল। টিভিই মূল। টিভি চ্যানেল দিন দিন বাড়লেও অনুষ্ঠানের মান কমছে। এক সময়ে বিটিভির সাপ্তাহিক নাটক, সিরিয়াল এসব দেখার জন্য সবাই টিভির সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। এখন বেড়েছে বিজ্ঞাপনের অত্যাচার। মধ্যবর্তী সময়ে দীর্ঘ বিজ্ঞাপন চলতে থাকে। দর্শক বিরক্ত হয়ে চ্যানেল বদলে দেন। ভারতীয় চ্যানেল জায়গা দখল করেছে। স্টার জলসা, জি বাংলার সিরিয়াল, অনুষ্ঠান ইত্যাদি অনেকটা নেশার মতো। তবে কিছু অনুষ্ঠান ও সিরিয়াল বাদ দিলে বাকীগুলির গল্প ঘুরে ফিরে একই ধরণের বিষয়কে কেন্দ্র করে। কূট-কাচালী ও ত্রিমুখী, চতুর্মুখী প্রেমের প্রধান্য। তবে বিজ্ঞাপনের সময়সীমা নির্দিষ্ট থাকায় ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে না। প্রেম ভালোবাসা এখন সেলিব্রেটি কেন্দ্রিক। হয়তো সাধারণ মানুষের মন থেকে রোমান্স হারিয়ে গেছে। থাকলেও একসময়ে তা হয়ে উঠে হিংসাত্মক, প্রতারণামূলক। যার পরিণতি হয় ধর্ষনে কিংবা খুনে।
৯. খেলাধুলা বিশেষত: ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন দুর্জয় শক্তি। সাকিব, মাশরাফি, তামিম, মুশফিকদের ছাড়িয়ে ওয়ান্ডার বয় মুস্তাফিজুর এখন ক্রিকেট বিশ্বে একটি সেনসেশন। ভালো বই, ম্যাগাজিন ইত্যাদি মফ:স্বল শহরের বই পাড়ায় পাওয়া যায় না। এগুলি পেতে ঢাকার দু’একটি নির্দিষ্ট মার্কেট আছে। যেমন আজিজ সুপার মার্কেট। হরেক রকমের বইয়ের মেলা। সব মিলিয়ে বইয়ের অভাব এবং টিভি, ইন্টারনেট, ফেসবুক ইত্যাদির কারণে পাঠক কূল ক্রমশ: কমছে। তবে বাংলাদেশে দৈনিক পত্রিকাগুলি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এমনকি জেলা শহরে ও ছোট ছোট শহরে ভালো ভালো পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। পত্রিকার পাঠক তুলনামূলকভাবে বাড়ছে।
১০. পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। মনকাড়া ফ্যাশন আর ভালো মানের কাপড়। গার্মেন্ট বা পোশাক শিল্পে ভালো ভালো ডিজাইনার সহ অনেক মেধাবী লোক নিয়োজিত থাকায় এ শিল্পের ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল।
১১. রাজনীতি, গণতন্ত্র, নির্বাচন এগুলি দেশের ও বিশ্বের সার্বিক অবস্থার নিয়ন্ত্রক। আমরা এর ব্যতিক্রম নই। আমাদের দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি আছে। সেটি হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। আমাদের আছে দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাসের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন দেশ। এ সরকারের আমলে জাতির জনকের হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, আরো হবে। এদিক থেকে ইতিবাচক সাফল্য। তবে রাজনীতি ও গণতন্ত্র যেহেতু বহুদলীয় সেই ক্ষেত্রে অন্য দলের ভিন্ন বক্তব্য আছে গণতন্ত্র ও নির্বাচন বিষয়ে। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাই মিলনের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
১২. লিখতে লিখতে অনেক কথা লিখা হয়ে যায়। পুরনো দিনের সুখ স্মৃতি ও সুখের সমাজ চোখের সামনে সব সময় আনাগোনা করে। সেই সমাজে পরষ্পরের প্রতি ছিল দৃঢ় ভালোবাসার বন্ধন। আমরা অনেক বিষয়ে অনেক উন্নতি করলেও সেই সমাজ হারিয়েছি। সহমর্মিতা, ভালোবাসা হারিয়ে গেছে। এমন দিনে মনে হয় সেই ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ অটুট সমাজটা আবার ফিরে আসুক। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর পত্রিকার বর্ষপূর্তিতে সবাই আনন্দিত। পত্রিকাটি পাঠকের মনোবাসনা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। এ পত্রিকার উত্তরোত্তর শ্রী বৃদ্ধি হোক। বিদায়।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক


