নায়করাজের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি- অশ্রুভেজা বিদায়.. বনানী কবরস্থানে আজ দাফন

সু.খবর ডেস্ক
‘এই সবুজের শ্যামল মায়ায় দৃষ্টি পড়েছে ঢাকা’_ তেমনটিই দেখা গেল গতকাল মঙ্গলবার নায়করাজের বাসভবনে, প্রিয় কর্মক্ষেত্র এফডিসিতে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কারণ, তিনি যে মহানায়ক_ চিরসবুজ, তার শ্যামল মায়াতেই আচ্ছন্ন এ দেশের কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি। নীল আকাশের নিচে শরণার্থী হয়ে যে মানুষটি একদিন একা-একা এই দেশে এসেছিলেন, তিনি তাই কখনও একা ছিলেন না। শেষ বিদায়ের দিনটিতেও বার বার সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানালেন তাকে। শ্রদ্ধা জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন শিল্পী-সহকর্মীরা। আকাশের কান্নাও ঝরে বৃষ্টি হয়ে। গতকালই এফডিসি ও গুলশান আজাদ মসজিদে দুই দফা জানাজা হয় নায়করাজ রাজ্জাকের। আজ বুধবার ভোরে রাজ্জাকের মেজ ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পী দেশে ফেরার পর সকাল ১০টায় তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। এর আগ পর্যন্ত তার মরদেহ থাকবে ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে।
সোমবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নায়করাজ। রাতে তার মরদেহ ছিল ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে। সেখান থেকে গতকাল সকালে তার মরদেহ শেষবারের মতো নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের বাসভবন লক্ষ্মীকুঞ্জতে। স্বজনদের কান্নায় তখন ভারি হয়ে ওঠে চারপাশ। সেখান থেকে তার মরদেহ বেলা ১১টায় নিয়ে আসা হয় তার অর্ধশতাব্দীর কর্মস্থল প্রিয় এফডিসিতে। শেষবারের মতো নায়করাজের এফডিসিতে আগমনের ক্ষণে কেঁদে ওঠে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সঙ্গে স্বয়ং প্রকৃতি। অঝোরে বৃষ্টি ঝরতে থাকে। বৃষ্টির মধ্যেই সবাই ভালোবাসার অর্ঘ্য দেন তাদের প্রিয় নায়ক, প্রিয় মানুষের শবদেহে।
এফডিসিতে লাশবাহী গাড়ির খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে শেষবারের মতো সবাই দেখেন নায়করাজকে। একে একে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি। এখানে শ্রদ্ধা জানায় তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, চলচ্চিত্র পরিবার, সিনেম্যাক্স মুভি পরিবার, আওয়ামী সাংস্কৃতিক লীগ, বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাব, চলচ্চিত্র গ্রাহক সংস্থা, চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, সিনে স্থির চিত্রগ্রাহক সমিতি, জাসাসসহ বিভিন্ন সংগঠন। ব্যক্তিগতভাবে রাজ্জাককে শ্রদ্ধা জানান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার, অভিনেতা আলমগীর, চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী, সুচন্দা, ববিতা, চম্পা, শাবনূর, চিত্রনায়ক শাকিব খান, ফেরদৌস, আমিন খান, রুবেল, আহমেদ শরিফ, ওমর সানি, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি অভিনেতা মিশা সওদাগর, চলচ্চিত্র পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবর, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, চলচ্চিত্র পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম প্রমুখ। প্রিয় অভিনেতাকে শ্রদ্ধা জানানোর পর সেখানে তার প্রথম জানাজা হয়।
এ সময় সবার উদ্দেশে রাজ্জাকের বড় ছেলে অভিনেতা বাপ্পারাজ বলেন, ‘আমার আব্বা সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। তিনি জীবনের পুরোটা সময় আপনাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি যদি কাউকে তার অজ্ঞাতে কষ্ট দিয়ে থাকেন, তা হলে তাকে ক্ষমা করবেন। কারও সঙ্গে যদি কোনো লেনদেন থেকে থাকে, তাহলে আমার বা আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। ‘
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এ দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু নায়করাজ রাজ্জাক ভেবেছেন। আমরা সরকারিভাবে তার এই কার্যক্রমকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব। যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তার কর্মময় জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে।’
তারকাদের শ্রদ্ধাকথন :এফডিসিতে শেষবারের মতো তাকে দেখতে এসেছিলেন নায়করাজের প্রথম নায়িকা সুচন্দা। তিনি বলেন, ‘রাজ্জাক নায়কের মতো রূপালি পর্দায় এসেছিলেন। তার চলে যাওয়াটাও নায়কের মতোই। বাস্তব জীবনেও তিনি মহানায়ক ছিলেন।’ ববিতা বলেন, ‘পর্দায় রাজ্জাকের উপস্থিতিই ছিল অন্যরকম। এখনকার নায়করাও তাকে অনুসরণ করে। আমার জীবনের ব্যবসা সফল ও ভালো সব ছবি রাজ্জাকের সঙ্গে।’ আলমগীর বলেন, ‘আমার বলার কিছুই নেই। একজন সন্তান পিতাকে হারালে যেমন কষ্ট পায়, আমি তেমনিই কষ্ট পাচ্ছি।’ গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘রাজ্জাক ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল, এ দেশের চলচ্চিত্র বিশ্বদরবারে স্থান করে নেবে। তা হলেই তার স্বপ্ন সার্থক হবে, আত্মা শান্তি পাবে।’ চম্পা বলেন, ‘তার সঙ্গে খুব কম ছবিতেই কাজ করেছি। তবে ওনার মতো অভিভাবক আমরা আর পাব কি-না জানি না।’
শাবনূর বলেন, ‘পর্দার নায়করাজের চেয়ে, পর্দার পেছনের রাজ্জাক আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ শাকিব খান বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম এবং আগামী যত প্রজন্ম আসবে তাদের কাছে নায়করাজ প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।’ ওমর সানী বলেন, ‘তাকে আমরা অবেলায় হারালাম। তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।’ রুবেল বলেন, ‘রাজ্জাক ভাই এমন একজন মানুষ ছিলেন, যার অভাব পূরণ হওয়ার নয়।’
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নায়করাজ :এফডিসি থেকে মাত্র ৪০ মিনিটের জন্য সর্বস্তরের জনতার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয় রাজ্জাকের মরদেহ। তবে এর এক ঘণ্টা আগে থেকেই সেখানে তার ভক্ত-অনুরাগীরা আসতে থাকেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যবস্থাপনায় এ নাগরিক শ্রদ্ধানুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের ফুলেল শ্রদ্ধায় সিক্ত হন প্রিয় এ অভিনেতা। পুরোটা সময় রাজ্জাকের মরদেহের পাশে ছিলেন দুই ছেলে বাপ্পারাজ ও সম্রাট, চিত্রনায়ক জাভেদ ও শাকিব খান, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ।
তাকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, বিটিভির পরিচালক নাসির আহমেদসহ আরও অনেকে।
এ সময় বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, অভিনয় শিল্পী সংঘ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, এনটিভি, গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদ, ঋষিজ, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ওয়ার্কার্স পার্টি, দৃষ্টিপাত নাট্য সংসদ, মুক্তধারা সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাউল একাডেমি ফাউন্ডেশন, যুব সমিতি, সুবচন নাট্য সংসদ, দনিয়া সাংস্কৃতিক জোট, ডিরেক্টরস গিল্ড, দেশ টিভি, প্রজন্ম ৭১, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নায়করাজকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। গোলাপ এবং অন্যান্য ফুল নিয়েও অনেক ভক্ত-অনুরাগী ব্যক্তিগতভাবে তাকে শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় রাজ্জাকের অভিনয় জীবন সম্পর্কে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ দশক তিনি আমাদের চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন এ বাংলার উত্তম কুমার।’ সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বাংলা ছবির নির্মাণের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে বলতে হয়, যে ব্যক্তির ওপর বাংলা চলচ্চিত্র দাঁড়িয়েছিল তিনি রাজ্জাক। নিজের দক্ষতা ও গুণে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি আমাদের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রধান স্থপতি আজ চলে গেলেন।’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘রাজ্জাকের বিনয়ের প্রেমে পড়েনি, এমন মানুষ নেই। এত জনপ্রিয় মানুষ হয়েও সে তার অতীতকে ভোলেনি। বড়দের, সব শ্রেণির মানুষকে সম্মান করা ছিল তার স্বভাবগত ব্যাপার।’ নাট্যজন আতাউর রহমান বলেন, ‘আমাদের যখনই দেখা হতো, আমরা আড্ডায় মেতে উঠতাম। আমি ওর চেয়ে বয়সে মাত্র এক বছরের বড়। তবে আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।’
রোজিনা বলেন, তাকে আমার জীবনের প্রথম ছবি ‘আয়না’তেই নায়ক হিসেবে পেয়েছিলাম। তার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে আমার হাত-পা কাঁপছিল। তা বুঝতে পেরে তিনি আমাকে সাহস দিয়েছিলেন। অভিনয়ের অনেক কিছুই শিখেছি তার কাছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। জয়া আহসান বলেন, তার বাচনভঙ্গি থেকে শুরু করে সবকিছুই দারুণ মার্জিত। এরকম পারফেক্ট একটা মানুষকে হিরো হিসেবে দেখি না এখনও।
দাফন আজ :বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে মেজ ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পী ইতিমধ্যেই ঢাকার উদ্দেশে বিমানে চড়েছেন। কানাডা থেকে আজ বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় তার ঢাকায় পেঁৗছানোর কথা। চিত্রনায়ক আলমগীর বলেন, পরিবারের সবার ইচ্ছানুযায়ী, বাপ্পী আসার পর সকাল ১০টায় বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে নায়করাজকে। তখন আরও একবার জানাজা হওয়ার কথা রয়েছে।