নায়করাজের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

গত সোমবার বিকালে ৭৫ বছর বয়সে জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নায়করাজ রাজ্জাকের। আগে থেকেই শক্ত অবস্থান করে নেয়া উত্তম-সুচিত্রার মতো রোমান্টিক জুটির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার সময়ে বাংলাদেশ অংশের বাংলা চলচ্চিত্র যখন প্রচ- হুমকির সন্মুখিন হয়েছিল তখন সুদর্শন রাজ্জাক এসে এই পতন রোধ করেন। কখনও শাবানার সাথে কখনও কবরীর সাথে কখনও ববিতার সাথে জুটি বেঁধে নায়করাজ রাজ্জাক বাংলাদেশি দর্শকদের উত্তম-সুচিত্রা জুটির মুগ্ধতার মাঝেও অন্যরকম আরেক মুগ্ধতা ছাড়িয়ে দেন। রাজ্জাক অভিনীত বহু ছবি ভীষণ রকমের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। জহির রায়হানের বেহুলা চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রাজ্জাকের বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে সেই যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এর পর তাঁকে আর কখনও পিছনে তাকাতে হয় নি। একের পর এক আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নীচে, জীবন থেকে নেয়া, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশিক্ষিত, ছুটির ঘণ্টা’র মতো অজ¯্র ছবিতে তাঁর অভিনয় দক্ষতা তাঁকে নায়করাজ ভূমিকায় অভিষিক্ত করে। তিনি বাংলাদেশি বাংলা চলচ্চিত্রকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যা এখন স্বর্ণযুগ হিসাবে দর্শক হৃদয়ে নন্দিত। মনে রাখতে হবে, রাজ্জাক যখন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য চলচ্চিত্রই ছিল অন্যতম বিনোদন উপকরণ। সেই সচেতন দর্শকরা ছবির প্রতিটি চরিত্র, গল্প, নায়ক-নায়িকাসহ অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতা সবকিছুই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। দর্শকরা মূল্যায়ন করতেন গভীরভাবে। সেসময়ে যেকোন অভিনেতার জন্য দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার বিষয়টি সহজ বিষয় ছিল না। দর্শকদের চুলচেড়া বিচারের মানদ-ে উত্তীর্ণরাই কেবল টিকে যেতেন। রাজ্জাক সেই সৌভাগ্যবান অমিত ক্ষমতাধর অভিনেতা যিনি ১৯৬৬ সনের পর থেকে অন্তত দুইটি দশক একটানা দর্শকচিত্তে স্থায়ী আসন গেঁড়ে বসেছিলেন। আর কেউ তাকে টলাতে পারে নি। এমন এক ক্ষণজন্মা অভিনেতার জীবনাবসান সত্যিকার অর্থেই বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এরকম মহান অভিনেতার যখন জীবনাবসান ঘটে তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়। রাজ্জাকের প্রয়াণে আজ সারা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গব্যাপী যে আলোচনার সুর লক্ষ করা যাচ্ছে সেটি তাঁর মহত্ত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। জনচিত্তের ভিতরে এই যে জায়গা করে নেওয়া সেটিই একজন সফল ব্যক্তির পরিচয়। আমরা নায়করাজের জীবনাবসানে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
বাংলা চলচ্চিত্র আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে সেটি দেখে এই প্রজন্ম সোনালী যুগে চলচ্চিত্রের অবস্থা সম্পর্কে কিছুই বুঝবে না। আজ ঘরে ঘরে নানাবিধ বিনোদনসম্ভারের উপচে উঠার সময়ে মানুষ হলে বসে একটি সিনেমা দেখার জন্য ব্যাকুল হয় না, এমন একটি খোড়া অজুহাত দেখানো হয় চলচ্চিত্রের মান অবনমনের কারণ হিসেবে। কিন্তু এই যুক্তি ধুপে টিকে না যখন আমরা দেখি বাহুবলির মতো হিন্দি সিনেমা অতীতের রেকর্ড ভেঙ্গে ব্যবসা সফলতার নতুন রেকর্ড গড়ে। বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনের দিকে তাকালে বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্রের আগমন ঘটতে দেখি আমরা এখনও। আমাদের দেশের আয়নাবাজি, বাপজানের বায়োস্কোপ, টেলিভিশন ইত্যাদি ছবি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। আজ যখন আমরা নায়করাজ রাজ্জাকের প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে মধুর স্মৃতিচারণ করছি তখন অবশ্যই সেখানে ওই অঙ্গনকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় সেটিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ। চলচ্চিত্র এমন এক শিল্পমাধ্যম যেটির মাধ্যমে সরাসরি মানুষের হৃদয়ে ঢুকে যাওয়া যায়। একটি ভাল চলচ্চিত্র মানুষকে শুভবোধের দিকে আকৃষ্ট করতে পারে, মন্দ উপসর্গ থেকে দূরে রাখতে পারে। রাজ্জাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই জায়গায় যদি কিছু কাজ হয় তবে সেটিই হবে তাঁর প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা নিবেদন।