নিবন্ধিত সিম দিয়ে অপরাধ ও আমাদের প্রতিরোধ-সক্ষমতা

দেশে নিবন্ধিত সকল অপারেটরের মোবাইল ফোন সিম রেজিস্ট্রেশন শেষ হওয়ার পরও যখন মোবাইল ফোনে প্রতারণা করা হয় কিংবা হুমকি দেওয়া হয় তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না ভূতের মধ্যেই সর্ষে লুক্কায়িত রয়েছে। কারণ মোবাইল ব্যবহারকারী তখন কাউকে হুমকি দিয়ে নিজের পরিচয় জানান দেয়ার মতো বোকামি করত না। এখনও যেসব মোবাইল থেকে এরকম প্রতারণা অথবা হুমকি দেয়া হয় সেসব মোবাইল ব্যবহারকারীরা নিশ্চিত যে, এর ফলে তাদের পরিচয় জানবে না কেউ। যে পরিচয়টি জানা যাবে সেটি ভুয়া হবে। গতকালই দৈনিক সমকালের ২য় পৃষ্ঠায় মাত্র ২ শ’ টাকার বিনিময়ে রেজিস্টার্ড সিম কেনা যায় এমন একটি খবর ছাপা হয়েছে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে একজন উদ্যমী মন্ত্রী তারানা হালিমের অক্লান্ত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশব্যাপী দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় সিম নিবন্ধনের যে মহাযজ্ঞ সম্পাদিত হলো, এর উপযোগিতা তাহলে কোথায়? এই সিম রেজিস্ট্রেশনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধপ্রবণতা রোধ করা। বিটিআরসির ঘোষণা মোতাবেক ১ জুন থেকে অনিবন্ধিত সিম বন্ধ হয়ে গেছে। এখন অপরাধপ্রবণতায় যেসব সিম ব্যবহৃত হচ্ছে সেগুলো নিশ্চয়ই কোন না কোন ভাবে নিবন্ধন করা রয়েছে। অপরাধীরা নিজের প্রকৃত পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সিম রেজিস্ট্রেশন করাবে এটি ভাবার কোন কারণ নেই। অপরাধীরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেই সিম রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে। রেজিস্ট্রেশন পর্যায়ে এমন কত লক্ষ কিংবা কোটি সিমকে অবৈধভাবে বৈধতা দেয়া হয়েছে তার হিসাব জানা নেই, তবে এই নিবন্ধিত কিন্তু প্রকৃত অর্থে অবৈধ সিমগুলো সনাক্ত করা এখনকার একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
দেশের সবগুলো সিম প্রকৃত পরিচয়ে নিবন্ধিত হলে সুনামগঞ্জের যুবলীগ নেতা সবুজ দাসকে হত্যার হুমকি সম্বলিত বার্তা পাঠানোর সাহস হতো না কোনভাবেই। পুলিশ অন্তত গতকাল পর্যন্ত হুমকি প্রদানকারী মোবাইলের মালিকের পরিচয় সনাক্ত করতে পেরেছেন বলে জানা যায়নি। অথচ নানা কারণে এই রহস্যজনক হুমকি প্রদানের সাথে জড়িত মোবাইলের পরিচয় সনাক্ত করা একটি জরুরি বিষয় ছিল। নতুবা সুনামগঞ্জের মানুষের মনে এক ধরনের আতংক তৈরি হবে। দেশব্যাপী যে সহিংসতা ও গুপ্তহত্যা চলছিল সৌভাগ্যক্রমে তা থেকে মুক্ত ছিলাম আমরা। কিন্তু সবুজ দাসকে হুমকি দিয়ে পাঠানো একটি বার্তা আমাদেরকে কিছুটা চিন্তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই চিন্তা দূর করতেই রহস্য উদঘাটন প্রয়োজন। জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার উভয়েই বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিয়ে এর রহস্য উদঘাটনের আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা দ্রুত জানতে চাই সবুজ দাশকে কোত্থেকে কে এই হুমকিসম্বলিত বার্তা পাঠিয়েছে।
ডিজিটাল প্রতারণা রোধে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে হবে, যারা এসব অপারেট করবেন তাদেরকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভার্চুয়াল জগতটি জটিল ও বিস্তৃত একটি জায়গা। এখানে যত অনুষঙ্গ রয়েছে সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে কেউ এর অপব্যবহার রোধ করতে পারবে না। সরকার অবশ্য পুলিশ বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করছেন। তবে এর বিস্তৃতি আরও বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ভার্চুয়াল অপরাধ মোকাবিলা বিষয়ে সক্ষম করতে হবে। আমাদের জীবনের সকল কাজই একসময় অনলাইনে পরিচালিত হবে। এখনই আমরা বহুলাংশে অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছি। জীবনের এই ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্থায়িত্ব দিতেই তৈরি হতে হবে সকলকে।  নতুবা সামনে আরও কত বিপর্যয় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে কে জানে।