পুলক রাজ
এত অসুবিধায় আমি আগে কখনো পড়িনি। দেশে লকডাউন দেওয়ার প্রথম কিছু দিন দোকান বন্ধ ছিল। কিছু টাকা জমানো ছিলো, সে সময় খরচ হয়ে গেছে। এখন আবার কিছু সময়ের জন্য দোকান খোলা থাকলেও কোন কাস্টমার নেই। তিনি বলেন, পান বিক্রি করে আমার সংসার চলে। এরকম আর কতদিন চলবে, আমার মতো নিম্ন আয়ের মানুষদের খুব কষ্ট হচ্ছে। আয় বন্ধ থাকলে সংসার চলবে কি করে। কথাগুলো বলছিলেন পৌর শহরের মোক্তার পাড়ায় পান বিক্রেতা আনিসুল হক ফরহাদ।
একই অবস্থা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নিম্ন আয়ের মানুষদের। লকডাউনের কারণে আয় রোজগার বন্ধ থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্দিনে পড়েছেন। করোনার প্রথম ঢেউয়ের প্রভাব কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ঢেউ। গত বছরের ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেকেই এখনও বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ওই সময় দেশে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ হয়েছিল। নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সেই ধাক্কা সামলে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব সামাল দিতে গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এর পরও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে সার্বিক কার্যাবলি ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যাকে বলা হচ্ছে সর্বাত্মক লকডাউন। এতে জরুরি পণ্য ও সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত কার্যক্রমের বাইরে সবকিছু বন্ধ রাখা হয়েছে। এই লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। এতে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছেন নতুন করে।
রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, হকার, দিনমজুর, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কামার, জেলে, দর্জি, বিভিন্ন ধরনের মিস্ত্রি, নির্মাণ শ্রমিকসহ দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কাজ থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে ভ্যানচালক, ঠেলাগাড়িচালক, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, তালা-চাবির মিস্ত্রি, সাইকেল-ভ্যান, রিকশা ও মোটর গ্যারেজের কর্মীদেরও। মোবাইল রিচার্জের ব্যবসায়ী, ফুল বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পশ্চিম বাজার ফ্লেক্সি লোডের ব্যবসায়ী পভেল মিয়া বলেন, লকডাউনের কারণে শহরে মানুষ কম বের হচ্ছে, তাই কাস্টমারও কম। রুজিও কম। রুজি না হলে সংসার চালাবো কেমন করে।
ফুটপাতে বসা দোকানী বিক্রম রায় বলেন, লকডাউনের সময় দোকান বন্ধ রাখলে খাব কি। কিছুদিন জমানো টাকায় সংসার চালিয়েছি। এখন হাতে একদম টাকা নেই। করোনার ভয়ে ব্যবসা না করলে তো না খেয়ে মরতে হবে। সরকার থেকেও আমাদের সাহায্য দেয়া হয় না।
পিংকু বণিক বলেন, লকডাউনের পর থেকে আমার দোকান বন্ধ রয়েছে। সংসার চালিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছি। কর্মহীন ও নি¤œ আয়ের মানুষদের সহায়তায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
রড সিমেন্ট দোকানের কর্মী লোকমান হোসেন বলেন, মহাবিপদের মধ্যে আছি। আমি দিন আনি দিন খাই। আগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা প্রতিদিন রুজি হতো। লকডাউনের পর থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় নেমে এসেছে।
রিকশা চালক অর্জুন দাশ বলেন, শহরে মানুষ কম। যারা বের হন তারাও মানুষ রিকশায় উঠতে চায় না। কড়া রোদের ১০০ টাকা রুজি করতে প্রচুর কষ্ট হয়। রিকশার মালিককে কি দিবো আর নিজে কি নিবো। অনেক দিন পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়।
ওয়ার্কশপ কর্মচারী নয়ন দাশ বলেন, কাম কাজ একেবারেই নাই। পরিবার নিয়ে খুবই কষ্টে দিন কাটছে আমাদের।
ঠেলা চালক বিমল মিয়া বলেন, মনে হচ্ছে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পেটে ভাত না থাকলে করোনা ভাইরাসকে ভয় পেয়ে লাভ কি। আগে তো পেট বাঁচাতে হবে।
টেইলার্স মুর্শেদ আলী বলেন, আমরা টেইলার্সরা গত পহেলা বৈশাখে কোন কাজ পেলাম না। সামনে ঈদ আসছে মানুষ খাবে না কাপড় সেলাই করাবে। মহা ঝামেলায় আছি। আয় রোজগান না থাকলে পরিবার চালাবো কি করে।
অটো রিকশা চালক আনোয়ার মিয়া বলেন, রুজি কম থাকায় পরিবারকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কেমন আছি জনপ্রতিনিধিরা খোঁজ খবর নেয় না।
বাস কন্ট্রেকটার মইনুল হক বলেন, বাস চলা বন্ধ হওয়ায় পর থেকে আমি সিএনজি ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছি। কিন্তু রুজি তেমন নেই।
চা বিক্রেতা জুবের আহমেদ বলেন, লকডাউনের পর থেকে আমার দোকান বন্ধ। আয় রোজগার বন্ধ হওয়ায় দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছি। আমাদের খোঁজ খবরও কেউ নেয় না। সরকারি ভাবে আমাদের সহায়তা প্রদানের দাবি জানাই।


