নির্জন হাওরে নিষ্ঠুর বৃক্ষ নিধন

বিশেষ প্রতিনিধি
জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার মাঝামাঝি হালির হাওরের হরিপুর-জারারকোণা বাঁধ থেকে কয়েক’শ হিজল-করচ গাছ কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। কারা এই গাছ কেটেছে, কেউই বলছেন না। স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, ‘প্রভাবশালীরাই গাছগুলো কেটেছে, বেশিরভাগ গাছেরই গোড়ায় কাটা হয়েছে। মেশিন বা করাত দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে গাছগুলো। গাছ কেটে নেওয়ায় এই হাওরে আসা অতিথি পাখিদের বসার স্থান নষ্ট হয়ে গেল। বর্ষা মৌসুমে বিশাল হাওর এলাকার মাছের অভয়াশ্রম নষ্ট হলো। তাতে অন্যান্য জীববৈচিত্রের উপরও প্রভাব পড়বে।
মঙ্গলবার সরেজমিনে হাওর এলাকায় গেলে স্থানীয় কৃষকরা বলেছেন, নভেম্বর মাসের ১৫ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে হালির হাওরের হরিপুর-জারাকোণা অংশের নির্জন হাওর এলাকায় কয়েক’শ গাছ কেটে নেওয়া হয়। গাছগুলো রাতে কাটা হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। নিরব এবং প্রত্যন্ত হাওর এলাকা হওয়ায় প্রথম প্রথম গাছ কাটার বিষয়টি চোখে পড়েনি স্থানীয়দের। এখন বেশি গাছ কাটা দেখে যারাই হাওরের দিকে যাচ্ছেন, তাঁদের চোখেই এমন নিষ্ঠুরতম কা- চোখে পড়ছে। হাওরপাড়ের জেলে কৃষকরা মনে করেন- যারা গাছ কেটে নিয়ে গেছে, তাঁদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া না হলে, এই হাওররক্ষা বাঁধে থাকা অন্যান্য গাছও কেটে সাবার করবে দুর্বৃত্তরা।
হাওরপাড়ের হরিপুর গ্রামের চিত্ত রায় বলেন,‘গাছের ডাল কেটে কেউ কেউ ঘরবাড়ি ‘আফাল’ থেকে রক্ষায় কাজে লাগিয়েছে। তবে বেশিরভাগ গাছই চুরি করে কেটে নেওয়া হয়েছে।’Untitled-1
বাঁধে দাঁড়ানো কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বললেন,‘গাছের গোড়ায় যেভাবে কাটা হয়েছে তাতে এই গাছগুলো আর বাঁচবে না। কোন সুস্থ্য মানুষ এমন কাজ করতে পারে না।’ তিনি জানালেন, হাওরাঞ্চলের টাঙ্গুয়ার হাওরের পরেই হালির হাওরে অতিথি পাখি বেশি আসে। এই গাছগুলো কাটায় অতিথি পাখির আবাসস্থল নষ্ট হলো।
স্থানীয় বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম তালুকদার বলেন,‘বিষয়টি জানার পর আমারও খারাপ লেগেছে, যেখানে গাছ কাটার ঘটনা ঘটেছে সেখানকার কয়েক কিলোমিটার অংশ নির্জন হাওর এলাকা, গাছগুলো কয়েকবছর আগে হাওররক্ষা বাঁধে লাগিয়েছিল সুন্দরপুর জলমহালের ইজারাদাররা। এখন কারা কেটেছে, কেনইবা এতো নিষ্ঠুরভাবে কাটলো, এই বিষয়টি খুঁজে বের করার জন্য আজ (বুধবারই) কিছু মানুষকে দায়িত্ব দিয়েছি, দেখা যাক দুর্বৃত্তদের খুঁজে পাওয়া যায় কী-না?’
পাউবো’র হালির হাওরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন দাস বলেন,‘গত ১৮ তারিখে এসে আমি প্রথমে দেখেছি কিছু গাছ গোড়া থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার গিয়ে দেখলাম কয়েক’শ গাছ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। খুবই দুঃখজনক ঘটনা এটি। এই আকারের গাছ হতে ৮-১০ বছর লাগবে। এই গাছগুলো বেরী বাঁধ রক্ষায় সহায়তা করে। জীববৈচিত্র রক্ষায় বিশেষ করে মাছ এবং পাখির জন্য গাছগুলো থাকা জরুরি ছিল। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে।’
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা এলাকার বীট কর্মকর্তা বীরেন্দ্র কিশোর রায় বললেন,‘গাছগুলো আমাদের লাগানো নয়, তবুও এতো গাছ এভাবে কাটার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে আসার জন্য আমাদের লোকজনকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়ে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো আমরা।’