নির্বাচন পরবর্তী পরিবেশের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে

নির্বাচনি পরিবেশের ক্ষেত্রে নির্বাচন পরবর্তী সময়টা থাকে খুব বেশি স্পর্শকাতর। এ সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বিশেষ উত্তেজনা ও ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। পরাজিত প্রার্থীরা হিসাব করেন কেন তার পরাজয় ঘটল। এই হিসাবে যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী চিহ্নিত হয়ে উঠেন- এদের কারণে এই পরাজয়, তখন কিছু ক্ষেত্রে হিংসাত্মক হয়ে সংঘর্ঘ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন তারা। সবচাইতে বেশি বিপদে পড়ের নিরীহ ভোটাররা। প্রার্থী বিশেষ কে তাকে ভোট দিয়েছে আর কে দেয়নি এই বিবেচনাবোধ কাজে লাগিয়ে অনুমিত বিরোধী ভোটারদের উপর চড়াও হন অনেকক্ষেত্রে। সরাসরি কোনো সাংঘর্ষিক ঘটনা না ঘটলেও প্রার্থী ও অনুমিত বিরোধী ভোটারদের মনোমালিন্য চলতে থাকে অনেক দিন। এমনও দেখা গেছে নির্বাচনের বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো প্রার্থী বা তার একান্ত সমর্থকরা বিরোধী পক্ষকে নানাভাবে ঘায়েলের চেষ্টা করেন। সামনাসামনি দেখা সাক্ষাৎ হলে এরা পরষ্পরকে এড়িয়ে চলেন, যেন কত দিনের চির শত্রুতা উভয় পক্ষের। শুধু পরাজিত প্রার্থী নয়, জয়ী প্রার্থীও এই হিংসা ও বিদ্বেষ মনে পোষণ করে রাখেন। তিনিও নিজের আচরণে বুঝিয়ে দেন- তুমি আমাকে ভোট দাওনি। অথচ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এমন আচরণ কারও ভিতর জাগ্রত হওয়ার কথা নয়। নির্বাচনী সংস্কৃতিতে একসাথে একাধিক প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা জেনেই প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন। জয়ের বিপরীত পিঠেই অবস্থান করে পরাজয়। জয়-পরাজয় দুইটাকে সমানভাবে গ্রহণ করার মাঝেই গণতান্ত্রিক মানসিকতা লুকিয়ে থাকে। পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই গণতান্ত্রিক মানসিকতা অর্জন করতে পারিনি। পারিনি বলেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নির্বাচনী সহিংসতার খবর আসে।
জেলার দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ হয়েছে ১১ নভেম্বর। নির্বাচনের জের ধরে দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ইউনিয়নে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ১৩ নভেম্বর। অন্যদিকে ছাতকের উত্তর খুরমা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আরেকটি সংঘর্ষ হয়ে গেলো ১৪ নভেম্বর। একদিন আগে পরে দুই উপজেলার এই নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনাগুলো একই সাথে আমাদের চিন্তিত ও শঙ্কিত করে তোলেছে। এই দুইটি ঘটনা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি এমন ছোটখাট ঘটনা নিশ্চয়ই আরো আছে। এই ধরনের অগণতান্ত্রিক আচরণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে প্রার্থীদের ভূমিকা সর্বাধিক বলে আমরা মনে করি। প্রার্থী যদি নিজের কর্মী সমর্থকদের নির্বাচন নিয়ে যেকোনো বিরূপ আচরণ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন তাহলে স্বপ্রণোদিত হয়ে কেউ অযথা বিপদ ডেকে আনবেন না। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের প্রতিই প্রার্থীদের আস্থা রাখতে হবে। যিনি একবার পরাজিত হয়েছেন তিনি পরের বার আবার জিতে আসতে পারেন। এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। সুতরাং একবারের পরাজয়কে চূড়ান্ত ভেবে বসার কারণ নেই। এইসব সংঘর্ষ বা সহিংস পরিস্থিতিকে ঠেকিয়ে রাখতে গ্রামীণ সমাজকাঠামো বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম। প্রতিটা ক্ষেত্রেই গ্রামীণ কাঠামোর ইতিবাচক হস্তক্ষেপ বুঝা যায় নতুবা সংঘর্ষগুলো আরও মারাত্মক হয়ে উঠত পারত। গ্রামে গ্রামে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি থাকে না। তারা খবর পেয়ে আসতে আসতে বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে। গ্রামের এই কার্যকর কাঠামো আছে বলেই ঘটনাগুলোকে থামানো সম্ভব হয়। এই কাঠামোর শক্তি যত বৃদ্ধি পাবে এসব অপকর্মও তত কমতে থাকবে।
সামনে আরও নির্বাচন আছে। ওই নির্বাচনগুলোর পরিবেশ যাতে কোনো অবস্থাতেই উত্তপ্ত না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের খেয়াল রাখা দরকার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, গ্রামের বিজ্ঞ ব্যক্তিবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচনী কর্মকর্তাগণ যদি যার যার অবস্থান থেকে উপযুক্ত ভূমিকা রাখেন তাহলেই কেবল নির্বাচন পূর্ব ও নির্বাচন পরবর্তী একটি ভালো পরিবেশ আমরা আশা করতে পারি।