মেশিন দিয়ে বেপরোয়াভাবে ছাতকের চেলা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ বিপর্যয়, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির উড়ন্ত রজ্জুপথ ধ্বংস ও বারকি শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার উপর অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। গত শনিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু আহরণ করতে হলে বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ জল পরিবহন সংস্থা) সহ সরকারের নানা দপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আমরা চোখের সামনে দেখতি পাচ্ছি যে, জেলা শহরের পার্শ্ববর্তী সুরমা নদীসহ প্রায় সকল নদীতেই যেমন ইচ্ছা তেমন ভাবে বালু ও পলিমাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব ড্রেজার মেশিন পরিচালনাকারীরা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কাজ করছেন বলেও জানা নেই কারও। আশ্চর্যজনক সত্য হলো, বস্তুত অবৈধভাবে এসব মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীবন-জীবিকার ব্যাপক ক্ষতিসাধন করলেও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কখনও এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন না। কেন করেন না এ নিয়েও কথা আছে বাজারে। অনেকে বলে থাকেন এই অবৈধ সুবিধাদানের বিপরীতে অনেকে বহু উপঢৌকন পেয়ে থাকেন। আবার ড্রেজার পরিচালনাকারী বা নিয়ন্ত্রকদের ক্ষমতা ও প্রভাবের কাছে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ অসহায় বলেও বলে থাকেন ভুক্তভোগীরা।
নদী খনন যেমন অপরিহার্য তেমনি অপরিকল্পিত নদী খনন করলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে এটিও সমান সত্য। তাই নদীর কোন এলাকায় কতটুকু খনন করতে হবে সেটি বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু ব্যবসায়ী ড্রেজার মেশিনগুলো এই নিয়মকানুনের থোরাই কেয়ার করে থাকে। অন্যদিকে জেলার শ্রমজীবী বহু মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হলো পাহাড়ী ছড়া বেয়ে নেমে আসা বালু ও পাথর আহরণ করা। এদের স্থানীয়ভাবে বারকি শ্রমিক বলা হয়ে থাকে। জেলায় নানা স্থানে কর্মরত এমন বারকি শ্রমিকের সংখ্যা এক লাখের নিচে হবে না। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের মুখের অন্ন সংস্থান করে পাহাড়ি বালু ও পাথর। এখন যান্ত্রিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে এই শ্রমজীবীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শ্রমজীবীদের জীবনের এই দুর্বিসহ অবস্থা শনিবারের প্রতিবেদনে বেশ ভাল করেই ফুটে উঠেছে। ছাতকের বারকি শ্রমিকরা এই ড্রেজার মেশিনের আগ্রাসন বন্ধ করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই দাবি ক্রমাগতভাবে সুনামগঞ্জ চলতি নদীতে কর্মরত বারকি শ্রমিকরাও জানিয়ে আসছেন।
বেপরোয়া ড্রেজার চালনার ফলে নদীর তীর ভাঙনের শিকার হয়েছে। নদী তীরবর্তী গ্রাম ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে পড়ছে। সুনামগঞ্জের চলতি নদী বর্তমানে বিশালাকার ধারণ করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে জেলায় যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে তা আটকানো কঠিন হবে। সুতরাং সময় থাকতে সাবধান হওয়া উচিৎ। আমরা সরকারের নিকট দাবি জানাই, যেখানে অনুমতিবিহীনভাবে এসব ড্রেজার মেশিন চালানো হচ্ছে সেগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হোক। আজ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছু মেশিন নষ্ট করা, আবার পরদিন থেকেই নতুন করে শুরুÑএমন ব্যবস্থা নয়। স্থায়ীভাবে এসব ড্রেজার মেশিন বন্ধ করে দিতে হবে। যেখানে নদী ড্রেজিং দরকার পড়বে সেখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোই এই কাজ করবে, অন্য কেউ নয়।

