পর্যটকদের কোলাহল নেই টাঙ্গুয়ার হাওরে

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
অন্য যে কোন বছরের চেয়ে এবার সৌন্দর্য্য বেড়েছে পর্যটনজোন তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ আশপাশের এলাকায়। প্রকৃতি যেন নিজেরমত করে অপরূপ সাজে সেজেছে। হাওরে এবার বিশাল জলরাশি। গাছাগাছালিও যেন সবুজের ছায়ায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তবে অন্যান্য বছরের মতো ঈদের ছুটিতে কোলাহল কম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে।
দেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের জীববৈচিত্র সমৃদ্ধ সবচেয়ে বড় জলাভূমি বিশ্বের অন্যতম রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। জল, জোছনা আর ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য একসঙ্গে দেখা যায় এখানে। পর্যটকদের প্রিয় এই জলরাশি এবং মেঘালয় পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য্য যেন নীরব আকাশ দেখছে। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান। ছয়কুড়ি বিল, নয়কুড়ি কান্দার সমন্বয়ের এ হাওরের দৈর্ঘ্য ১১ এবং প্রস্থ ৭ কিলোমিটার। শীত, গ্রীস্ম ও বর্ষা একেক ঋতুতে এই হাওড় একেক রূপ ধারণ করে। এই মৌসুমে অন্যান্য হাওরের সঙ্গে মিশে এটি সাগরের রূপ ধারণ করেছে। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরের উত্তর বংশিকু-ায় রয়েছে কয়েকটি আদিবাসী পল্লী। গারো-হাজং আদিবাসীর জীবন ও সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে পর্যটকদের। মূলত. শীতকালই এই হাওরে বেড়ানোর উত্তম সময় হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে একটু ভাল হওয়ায় গত কয়েক বছর হয় বর্ষা মৌসুমেই এই হাওরে পর্যটকদের ভিড় বেশি হচ্ছে।
হাওড়পাড়ের ইন্দ্রপুর গ্রামের অখিল দাস বলেন,‘সুনামগঞ্জে সুরমা নদীতে আব্দুজ জহুর সেতুসহ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা একটু ভাল হওয়ায় এখন প্রতিদিনই টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকরা আসছেন। এবারের ঈদের ছুটিতে সাগররূপ জলরাশি, আকাশে রোদে-মেঘের খেলা, মুষলধারে বৃষ্টি, হাওড়বাসীর সংগ্রামী জীবন, সবুজে ঢাকা মেঘালয় আর পানির উপর মাথা উঁচু করে থাকা নলখাগড়া-গাছগাছালি বন বাদালি দেখতে পর্যটকদের ভিড় হবার কথা ছিল। করোনার কারণে সব কিছুই যেন বদলে গেছে।
হাওরপাড়ের শহীদ সিরাজ লেক, লেকের পাড়ে সবুজে মোড়া ছোট ছোট টিলা, টেকেরঘাট, বারেক টিলা, জাদুকাটা নদী, শিমুলবাগান। হাওরে নৌকায় রাতযাপন আর গানবাজনার সঙ্গে জোছনা উপভোগ হাজারও পর্যটক এই ঈদের ছুটিতে হয়তোবা টাঙ্গুয়ায় আসতেন। সেটি এবার নেই।


বাজারের মুদি দোকানি থেকে শুরু করে নৌকা ও স্পিডবোটের মালিক, মাঝি, শিল্পী ও মোটরসাইকেলের চালক, হাওরপাড়ের রেস্টহাউসের সঙ্গে জড়িতরা অবসর দিন কাটাচ্ছেন। গত দুইদিন হয় আশপাশের উপজেলা, ইউনিয়ন থেকে কিছু মানুষ আসলেও এরা খাবার-দাবারসহ সব কিছুই সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। থাকছেনও কয়েকঘণ্টার বেশি নয়।
টাঙ্গুয়ার হাওরের গোলাবাড়ি এলাকায় ‘হাওর বিলাস’এর মালিক স্থানীয় বাসিন্দা খসরুল আলম। হাওরে পর্যটকদের যাওয়া-আসা এবং ঘুরে বেড়ানোর জন্য তাঁর তিনটি নৌকাও রয়েছে। এসবের আয় দিয়েই সংসার চলে খসরুল আলমের। খসরুল আলম বলেন, আমাদের এখন পথে বসার অবস্থা। সায় সম্পদ যা ছিল, সবকিছুই এই টাঙ্গুয়ার হাওরে এনে কাটাচ্ছি। এই অবস্থায় কীভাবে চলবো জানি না।
তাহিরপুর উপজেলা সদরে একমাত্র অভিযাত আবাসিক ‘টাঙ্গুয়া হোটেল’এর ব্যবস্থাপক আবুল হাসান রাসেল বললেন, প্রায় ৪ মাস হয় হোটেল বোর্ডার নেই। অনেক কর্মচারীর চাকরি গেছে। তারা বেকার সময় কাটাচ্ছেন।
হাওরের তেপান্তর ইজি ট্যুরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাবরুল হাসান জানান, হাওরে পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানো ও রাতযাপনের জন্য ৭০টি নৌকা, ২০ আধুনিক স্পিডবোট রয়েছে। এসব নৌকা তৈরিতে ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পর্যটকদের জন্য আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা রেখেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। এসব নৌকায় লোকজন হাওরে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি দল বেঁধে রাত্রিযাপন করেন। ভরা মৌসুমে একেকটি নৌকা প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা ভাড়াও যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের উত্তরপাড়ের পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য ৬০০ মোটর সাইকেল রয়েছে। এসবের চালকেরাও এখন কর্মহীন।
হাওরপাড়ের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খসরুল আলম জানালেন, তার ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষের আয়ের উৎস গত কয়েক বছর হয় পর্যটন নির্ভর। এরা এখন বেকার। আশপাশের কিছু মানুষ গত দুইদিন হয় টাঙ্গুয়ায় আসলেও স্থানীয় মানুষ তাতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে না।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, পর্যটক না আসায় লোকজন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, এটা ঠিক। কিন্তু করোনার এই মহামারির সময়টায় জেলার বাইরে থেকে পর্যটক আসলে ঝুঁকি থেকেই যায়, এজন্য আমরা নিরোৎসাহিত করছি।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ জানালেন ১৯ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জে টাঙ্গুয়ার হাওরসহ দর্শনীয় স্থানগুলোয় পর্যটকদের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। এটি এখনো বলবৎ রয়েছে।