আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর
ইঞ্জিন চালিত নৌকা কিংবা স্পীড বোটের আওয়াজ শুনলেই সমবেত কন্ঠে গান গাইতে গাইতে গ্রাম থেকে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে দৌড়ায় টাঙ্গুয়া পাড়ের ৩ গ্রামের অর্ধশতাধিক ছাত্রছাত্রী। ওয়াচ টাওয়ারে স্পীট বোট থামতে না থামতেই শিশুরা বাউল স¤্রাট শাহ আব্দুল করিমের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘মধু হই হই আঁরে বিশ হাওয়াইলা’, ‘আমরা সবাই হাওরবাসী হাওর ছাড়া বুঝি না’ গাইতে থাকে। স্কুলগামী শিশুরা পর্যটকদের আনন্দ দিয়ে টাকা রোজগারের আশায় বিদ্যালয়ে না গিয়ে এখন অপেক্ষায় থাকে পর্যটকদের।
জয়পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬ মাস পূর্বেও শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত। কিন্তু এখন আর বিদ্যালয়ে যায় না বললেই চলে। লেখাপড়ার চেয়ে এখন তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যটকদের দেয়া বি¯ু‹ট, চকলেট আর সামান্য ক’টা টাকা।
সরজমিন টাঙ্গুয়া হাওরে শিশুদের গান শুনতে শুনতে কথা হয় ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী লালচান, জবা জুয়েল ও ৩য় শ্রেণীর শিক্ষার্থী আকাশ এর সাথে। তারা জানায়, তারা সবাই জয়পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত ৬ মাস ধরে তারা সবাই দলবদ্ধভাবে হাওরে আসা পর্যটকদের গান শুনিয়ে আনন্দ দেয় এবং পর্যটকরা বিনিময়ে তাদের কিছু টাকা
দেন। বিদ্যালয়ে না গিয়ে গান গাইতে আসছ জানতে চাইলে দলনেতা এ প্রতিবেদককে একটু পাশ কাটিয়ে দূরে চলে যায়।
টাঙ্গুয়া হাওরপার ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন গ্রাম জয়পুর, গোলাবাড়ি, আলমপুর। এই ৩ গ্রামে শিশু- কিশোর রয়েছে ৩ শতাধিক। কিন্তু ৬ মাস ধরে হঠাৎ করেই বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি কমে যায়। প্রথম দিকে হাওরে দু’একজন শিশু ছোট নৌকা নিয়ে পর্যটকদের হিজল-করচ বাগানের ভেতর ঘুরে দেখাতো, গান গাইতো। এখন শতাধিক শিশু কিশোর রয়েছে এই পেশায়। অনেকে শিশু গান গেয়ে শুনাচ্ছে, আবার কিছু শিশু গাউড হয়ে পর্যটকদের নৌকায় করে হাওর ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। দিন দিন বিদ্যালয় বিমুখ হয়ে পড়ছে শত-শত শিক্ষাথী।
গ্রামের অধিকাংশ পরিবার হতদরিদ্র হওয়ায় অভিভাবকরাও বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবেই দেখছেন। ফলে কোমলমতি শিশু কিশোররা লেখাপড়া বাদ দিয়ে এর জড়িয়ে পড়ছে।
আলমপুর গ্রামের ছাত্র অভিভাবক সাইকুল ও নজরুল আলম বলেন, ‘নদী পার হয়ে আমাদের গ্রামের শিশুদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। গ্রাম থেকে একটু দুরে হওয়ায় শিশুরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে চায়না।’
জয়পুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘তিনি বিদ্যালয়ের ছাত্র অভিভাবকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের বুঝিয়ে আসেন কিন্তু অভিভাবকরা কেন জানি বিষয়টি আমলেই নিচ্ছেন না।’
টাঙ্গুয়া হাওরপাড়ের শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাজিনুর মিয়া বলেন, ‘হাওরে ফসলহানির কারণে হাওরপাড়ের বিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি কমে গেছে। অভাবের কারণেই ছাত্রছাত্রীরা টাঙ্গুয়া হাওরপাড়ে পর্যটক দেখলেই টাকা পাওয়ার জন্য তারা গান গায়।’
পর্যটক ফারুক আহমেদ বলেন, ‘এক সময় সাজেক যাওয়ার পথে দেখতাম শত শত শিশু রাস্তায় দাঁড়িয়ে পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাতো সামান্য চকলেট, বিস্কুটের আশায়। কিন্তু এবার টাঙ্গুয়া হাওরে এসে দেখলাম স্কুলগামী শিশুরা স্কুলে না গিয়ে হাওরে এসে পর্যটকদের বিনোদন দিতে গান গায়।’
তাহিরপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিপ্লব সরকার বলেন, ‘জয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্র্থীরা বিদ্যালয়ে না এসে হাওরে গান গাইতে যায় আমি নিজেও হাওরে তাদের গান শুনেছি। আমরা চেষ্টা করছি শিশুদের বিদ্যালয় মুখী করতে।’


