পাকা ধানের ম ম গন্ধ

বিশেষ প্রতিনিধি
আকাশে রোদ যেন কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক। মেঘ দেখলেই বুকটা ওঠে কেঁপে, দুরু দুরু করতে থাকে ঝড়ের আশংকাতে। এমন অবস্থা সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে। সোনামাখা রোদে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের হলুদ ধানের শিষ ঝিকিয়ে উঠেছে। পাকা ধানের ম-ম গন্ধে মাতোয়ারা হাওরপাড়ের প্রতিটি জনপদ। কৃষকেরা ব্যস্ত কে কিভাবে ধানে কেটে ঘরে আনবেন। কৃষকের ধ্যান জ্ঞান সবই এখন হাওরকে ঘিরেই।
সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে শুরু হয়েছে এখন ধান কাটার উৎসব। এই অঞ্চলে পহেলা বৈশাখ থেকে ধান কাটা মাড়াই শুরু হয়ে থাকে বহুকাল আগে থেকেই। কিন্তু গত কয়েক বছর হয় আগাম জাতের ধান আবাদ হওয়ায় কিছু ধান আগেই কাটা মাড়াই শুরু হয়। এখন হাওরজুড়ে চলছে সেটিই। শুক্রবার ধান কাটা উৎসব হয়েছে জামালগঞ্জের ছনুয়ার হাওরে। উপস্থিত ছিলেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার এমপি, জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহি অফিসার বিশ্বজিৎ দেব, সহকারী কমিশনার (ভূমি) রেজওয়ানুল ইসলাম, জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ, ভাইস চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী আফিন্দী রাজু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী, জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তারেক প্রমুখ। এর আগে বৃহস্পতিবার হয়েছে উৎসব বিশ^ম্ভরপুরের করচার হাওরে। বুধবার তাহিরপুরের শনির হাওরে ধান কাটা উৎসবে মেতেছিলেন কৃষকরা। পহেলা এপ্রিল ধান কাটা উৎসব হয়েছে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের হাওরে। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়েছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও।
ধান কাটার এই মৌসুমে প্রতিবছরের মতো এবারও আগাম বন্যা, ঝড় বৃষ্টির শঙ্খার পাশাপাশি হাওরের ঝাঙ্গালগুলো দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় কাটা ধান বহন করা নিয়ে চিন্তিত কৃষক।
শনির হাওরপাড়ের মধ্য তাহিরপুরের কৃষক রফিকুল ইসলাম বললেন, ৪০-৫০ টি গ্রামের কৃষক শনির হাওরে চাষাবাদ করেন। এমনও গ্রাম আছে কয়েক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে জমিতে যেতে হয় তাদের। হাওরের ৩০-৩৫ টি ঝাঙ্গালের (মাটির সড়ক বা গোপাট) কোনটা দিয়েই ঠেলা গাড়িও চলেনা। হাজার হাজার মণ ধান বহন করবে কিভাবে কৃষক। ধান বহনের দুর্ভোগের জন্য অনেকে কম দামে ধান খলাতেই ফড়িয়াদের হাতে তুলে দেন তারা। হাওরপাড়ের অন্যান্য কৃষকরা জানালেন, ধান কাটা শ্রমিকের অভাব আছে হাওরে হাওরে। হারভেস্টার মেশিনের স্বল্পতা রয়েছে প্রত্যেক হাওরে।
সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বললেন, জেলার বেশিরভাগ বড় হাওরেই কাটা ধান বহনের সংকট রয়েছে। ছোট ছোট খাল ভরাট হয়ে গেছে। হাওররক্ষা বাঁধের কাজ করার সময়ও খালগুলো সচল করার চিন্তা করা হয় না। হাওরের ঝাঙ্গালগুলোকেও ডুবন্ত পাকা সড়ক করা হচ্ছে না। এ কারণে কাটা ধান বহনের দুর্ভোগ জেলাজুড়েই রয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, শনির হাওরের ছোট বড় ২৫ টি জাঙ্গাল চিহিৃত করে স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে উন্নয়ন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, জেলায় এবার নতুন আরও হারভেস্টার মেশিন এসেছে। অন্য জেলা থেকে শ্রমিক আনারও চেষ্টা আছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় পাওয়া গেলে বেশিরভাগ ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জে এবার তিন লাখ ২৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষাবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক ফরিদুল হাসান জানিয়েছেন, হাইব্রিড কিছু ধান কর্তনের মধ্য দিয়ে এই জাতের ধানের কাটা শুরু হয়েছে। ২০ থেকে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ২৮সহ অন্যান্য হাইব্রিড ধানা কাটা শেষ হয়ে যাবে। ২৯ জাতের ধানসহ কিছু ধান কাটতে ১০ মে পর্যন্ত সময় লাগবে। এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন বেশি হবে বলে দাবি তার।