পাঠ্যবইয়ে প্রখ্যাতদের লেখা বাদ কেন: হাইকোর্ট

সু.খবর ডেস্ক
পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে প্রখ্যাত লেখকদের লেখা বাদ দেয়াকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার এবং বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের বেঞ্চ এক রুল জারি করে শিক্ষা সচিব ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানকে জবাব দিতে বলেছে। চার সপ্তাহের মধ্যে তাদেরকে এই জবাব দিতে হবে। একটি দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন যুক্ত করে শিক্ষাবিদ মোমতাজ জাহান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন রিট আবেদনটি করেন। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন রোকন উদ্দিন মাহমুদ ও মামুন মাহবুব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।
‘ছাপার পরও পাঠ্যবই সংশোধন, দায় নিচ্ছে না কেউ’ শিরোনামে গত ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের লিখিত প্রস্তাবে মোট ২৯টি বিষয় সংযোজন ও বিয়োজনের কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে এই দুটি লেখারও উল্লেখ ছিল। ২৭টি লেখা গ্রহণ ও বর্জন করা হলেও দেখা যায়, দাবি অনুযায়ী ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত থাকা অষ্টম শ্রেণির ‘রামায়ণ-কাহিনি’ (লেখক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী) এবং সপ্তম শ্রেণির ‘লালু’ (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) গল্প বাদ দেওয়া হয়নি। গল্প দুটিসহ বই ছাপা হওয়ায় বিপাকে পড়ে এনসিটিবি। এরপর ছাপা বই বাতিল করা হয় এবং সংশোধনের পর নতুন করে ছাপা হয়। এই পরিবর্তনে হেফাজতসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে ১৭টি লেখা বাদ পড়েছে। ওই ১৭টি লেখা পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার দাবি জানায় হেফাজতে ইসলাম। অন্যদিকে নতুন করে যুক্ত ১২টি লেখা বাদ দিতে বলে তারা। এই ১২টি লেখা ২০১৩ সালে পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয়েছিল।
পঞ্চম শ্রেণিতে তিনটি লেখা যুক্ত করে একটি লেখা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল হেফাজতে ইসলাম। এনসিটিবি তাই করেছে। হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা যৌথ বিবৃতি ও স্মারকলিপি দিয়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে হুমায়ুন আজাদের লেখা ‘বই’ কবিতাটি বাদ দিতে বলেছিলেন।
হেফাজতের পক্ষ থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে তিনটি নতুন বিষয় যুক্ত করার দাবি ছিল, যা এনসিটিবি মেনে নিয়েছে। এ বছরের বইয়ে নতুন যুক্ত করা হয়েছে ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’, ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’। হেফাজতের দাবি মেনে এই তিনটি বিষয় যুক্ত করে বইটি থেকে হুমায়ুন আজাদের ‘বই’ কবিতা এবং গোলাম মোস্তফার ‘প্রার্থনা’ কবিতা (অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি/বিচার দিনের স্বামী…) বাদ দেওয়া হয়।
চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে ‘খলিফা হযরত উমর (রা.)’। এটি ২০০৫ সালের পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই থেকে নেওয়া হয়েছে। লেখাটি কার বা কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে, তার উল্লেখ নেই।
২০১৬ সালে চতুর্থ শ্রেণির একই বইয়ে ২২টি গদ্য ও পদ্য ছিল। ২০১৭ সালে হয়েছে ২৩টি, এর মধ্যে ২৩তম লেখা হযরত উমর (রা.)-কে নিয়ে। হেফাজতে ইসলাম এই লেখাটি যুক্ত করার সুপারিশ করেছিল।
তৃতীয় শ্রেণিতে যুক্ত করা হয়েছে ‘খলিফা হযরত আবু বকর’ শিরোনামে লেখা, এটাও যুক্ত করার দাবি ছিল হেফাজতের। দ্বিতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বইয়ে এ বছর যুক্ত হয়েছে ‘সবাই মিলে করি কাজ’ শিরোনামে একটি লেখা। এতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শত্রুদের মোকাবিলায় সবাইকে নিয়ে এবং নিজে অংশগ্রহণ করে কীভাবে পরিখা খনন করেছিলেন, তার বর্ণনা আছে। এটিও যুক্ত করতে বলেছিল হেফাজতে ইসলাম।
নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে হেফাজত পাঁচটি লেখা বাদ দেওয়া এবং পুরোনো পাঁচটি লেখা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছিল। তাদের সব দাবিই পূরণ করা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণিতে পাঁচটি লেখা বাদ দেওয়ার দাবিও মেনে নিয়েছে এনসিটিবি। এগুলো হচ্ছে মঙ্গলকাব্যের ‘আমার সস্তান’, ভ্রমণকাহিনি ‘পালামৌ’, বাউলের ওপর লেখা ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, কবিতা ‘সাঁকোটা দুলছে’ এবং ‘সুখের লাগিয়া’।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে কায়কোবাদের লেখা ‘প্রার্থনা’ কবিতা যুক্ত করতে বলেছিল হেফাজত। কবিতাটি অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’য় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ‘সততার পুরস্কার’ এবং সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নীলনদ আর পিরামিডের দেশে’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। সংগঠনটির প্রস্তাব অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘বাংলাদেশের হৃদয়’, ‘লাল গরুটা’ এবং ‘রাচি ভ্রমণ’ বাদ দেওয়া হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে ‘মরু-ভাস্কর’ নামে হবিবুল্লাহ্ বাহারের একটি গদ্য। অষ্টম শ্রেণিতে ফিরে এসেছে ‘বাবরের মহত্ব’ কবিতা।
বিতর্ক শিক্ষার প্রথম ধাপ নিয়েও
প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে লেখা হয়েছে, ‘ও-তে ওড়না চাই; যা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বলছেন, প্রথম শ্রেণির একজন শিশুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার সঙ্গে ও-তে ওড়না শেখানোর বিষয়টি সংগতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া ছেলেশিশুরাও বইটি পড়ে। ২০১৬ সালের ৮ এপ্রিল পাঠ্যপুস্তক সংশোধন ও প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেয় হেফাজতে ইসলাম। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের হুমকি দেয় সংগঠনটি। বিবৃতিতে হেফাজত নেতারা বলেন, বর্তমানে স্কুল পাঠ্যপুস্তকে ইসলামী ভাবধারার লেখা বাদ দিয়ে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদেরকে গরুকে মায়ের সম্মান, পাঁঠাবলির নিয়ম, হিন্দুদের তীর্থস্থানের ভ্রমণ কাহিনী এবং হিন্দু রীতিনীতি ও দেব-দেবীর নামে প্রার্থনা করার বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে চলমান উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ইসলামী আকিদা-বিশ্বাস এবং দাঁড়ি-টুপি ও পীর-মাশায়েখ বিরোধী কাল্পনিক কাহিনীর প্রশ্ন জুড়ে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীকে ইসলাম বিমুখী ও হিন্দুত্ববাদের মহানুভবতা প্রকাশ পায়, এমন উত্তর লিখতে বাধ্য করা হয়েছে।