পাঠ প্রতিক্রিয়া, ধ্বংসতত্ত্বের জয়যাত্রা

অ্যাডভোকেট এনাম আহমেদ
শিল্প-সাহিত্যে, সংস্কৃতির এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ সুনামগঞ্জ। ধানে-গানে-প্রাণে মুখরিত মানুষে মানুষে সাম্যের জয়গানের এটি একটি উপাখ্যান। সৃষ্টিশীলতার পথচলায় উত্থান পতন থাকলেও সম্প্রীতির কিছু কিছু ভালো মানের গ্রন্থ প্রকাশ করেছে এই শহরের লেখকরা। এক্ষেত্রে নতুন সংযোজন ফাইয়াজ ইফতির ‘ধ্বংসতত্ত্ব অথবা ইসরাফিলের শিঙা’। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তুহিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর হল জীবন এবং এর পারিপার্শিকতা নিয়ে এগিয়ে গেছে গল্পটি। লেখকের গল্প বলার ধরনটি অত্যন্ত চমৎকার। কাহিনীর চেয়েও টিকা-টিপ্পনি, বিভিন্ন পাশর্^ মন্তব্য সুখপাঠ্য করেছে গল্পটিকে। এজন্য পাঠকগণ পড়তে শুরু করলে বইটি আর হাত থেকে রাখতে পারবেন না। তা তিনি যত বেরসিক পাঠকই হননা কেন! তুহিন ছাড়াও, সূর্য, শুভ, আব্দুল্লাহ জেহাদি, ওয়াহহাবদের অবাধ বিচরণ রয়েছে গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। গল্পে এই চরিত্রগুলো এতো শক্তিশালী যে, বইটি পড়ে শেষ করার পড়েও এরা কয়েকদিন আমার আশেপাশে ঘুরাঘুরি করেছে। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে গল্পের কাঠামো সাজিয়ে সাধারণত একজন লেখক অগ্রসর হন। তবে একবার লেখা শুরু করলে কোন গল্পই আর লেখকের নিয়ন্ত্রনে থাকে না। সম্ভবত এক্ষেত্রেও তা থাকেনি। গল্পের রেশ বারবার টেনে ধরার চেষ্টা করেও মনে হয়েছে লেখক ব্যার্থ হয়েছে। এজন্য তা মোটামুটি বৃহৎ আকার ধারণ করেছে।
আসলে যৌবন শুধু যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় নয়, লেখালেখিরও শ্রেষ্ঠ সময়। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর অন্যতম সেরা উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ লিখেন ঢাবির শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় মহসিন হলে বসে। ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাক ড. আসিফ নজরুল নব্বই দশকের ছাত্ররাজনীতিকে উপজীব্য করে উপন্যাস লিখেছিলেন আমাদের ছাত্রাবস্থায়। সেগুলোও ছিল সুখপাঠ্য ও প্রাসঙ্গিক। ফাইয়াজ ইফতির ফিকশন লিখার ধার অত্যন্ত শক্তিশালী। এখানে উপজীব্য বিষয় ঢাবির ক্যাম্পাস ও হলগুলো হলেও গল্প ক্রমে ক্রমে নানা বিপদজনক প্রসঙ্গে মোড় নিয়েছে। এটি শুধু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নয়, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি বিভাগীয় শহরগুলোর পুরাতন অনার্স-মাস্টার্স কলেজের ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাসের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। এসব ক্যাম্পাসের প্রাক্তন যে কোন শিক্ষার্থী যখন এই বইটি হাতে তুলে নেবেন, তিনি হারিয়ে যাবেন আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে তাঁর শিক্ষা জীবনে। আর একজন মানুষ যখন জীবনের এ পর্যায়ে পিছনে ফিরে তাকান, তখন তিনি অনুধাবন করতে পারেন কত মধুময় ছিল তাঁর ফেলে আসা দিনগুলো! যদিও ‘ফেলবার’ আগে তা উপলব্ধি করা যায়নি। আর চলমান শিক্ষার্থীরা এটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ করলে ভবিষ্যতে ‘উচ্চ শিক্ষার যুদ্ধের’ জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার প্রস্তুতি তারা সেরে ফেলতে পারবেন।
আমাদের সময়কার ক্যাম্পাস সংস্কৃতির সাথে এখনকার কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হলো। সেসময় বিভিন্ন সংগঠনের তাত্ত্বিকরা নিজ নিজ সংগঠনের আদর্শ, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিজের সংগঠনে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতো। এমনকি নেতা-নেত্রীদের বাহ্যিক সৌন্দর্য্যও সংগঠনের অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হতো। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে সংগঠনগুলো বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসেন সাথে দেনদরবার করতো জনপ্রিয়তার আশায়। ঢাবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-ছাত্রলীগ নিয়মিত গোলাগুলি করতো। দিন শেষে মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে তারা আবার গলাগলি করতো! ক্যাম্পাসে সরকারের তীব্র সমালোচনা করা যেতো। এখন নাকি কতটুকু সমালোচনা করা যাবে তা আগ থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়। মধুর ক্যান্টিনের কোন কোনে কোন সংগঠন বসতে তা নির্ধারিত ছিল। আমরা সিলেট থেকে মাঝে মাঝে ঢাবিতে গিয়ে আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে মিলিত হতাম। ক্যাম্পাসে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের একটা আলাদা মূল্যায়ন ছিল। এটি আপসহীন, পরিচ্ছন্ন ও দেশ মাতৃকার স্বার্থ বিরোধী যে কোন সরকারি কর্মকা-ে গর্জে উঠতো।
সুনামগঞ্জের একটি বংশানুক্রমিক সুশিক্ষিত পরিবারের সন্তান ফাইয়াজ ইফতি। লেখকের বয়স বিবেচনায়, প্রথম গল্প বিবেচনায়, উপন্যাসটিকে ‘বিনিফিট অব ডাউট’ দেয়া যেতেই পারে। কিছু অসংলগ্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ভাষার যেনো প্রসার না হয় এটিই রুচিশীল পাঠকদের আর্তনাদ। ক্ষেপাটে লেখকের ক্ষেপাটে রচনার উৎসর্গপত্রে তিনি কিছুটা আপস করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রাচ্যদেশীয় আবেগ থেকে বের হতে পারেননি! গল্পের সাথে মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন আব্দুল্লাহ মারুফ রুসাফি। বইটি প্রকাশ করেছে ভূমি প্রকাশনী, মূল্য ৩৪০টাকা। সুনামগঞ্জে পাওয়া যাচ্ছে মধ্যবিত্ত বুক স্টলে। নস্টালজিয়ায় ডুব মারার অভিপ্রায়ে লিখা এই উপন্যাস পাঠকদেরও নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে দেবে। সাহসী লেখক, প্রকাশক, এমনকি গ্রন্থ সমালোচক! সারা বিশ্ব অশুভ ভাইরাসের বিচরণে যখন বিপর্যস্ত, তখন আবারও সাহিত্যে সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার মিশনে মেতেছে আমাদের তরুণরা। এ অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। চারিদিকে দানবের আস্ফালনের বিপরীতে ইফতিরা মানবতার জয়গান গেয়ে যাক, নতুন প্রজন্মের কাছে এটিই প্রত্যাশা।
লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট