পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু/ এই প্রবণতা রুখতে বহুমুখী তৎপরতা দরকার

চলতি বছর (২০২২ সন) জেলার বিভিন্ন জায়গায় পানিতে ডুবে মারা গেছে ৪৬ শিশু ও বয়স্ক। ৪৬ ব্যক্তির মধ্যে নৌকাডুবে মৃত্যুবরণকারী ৯ জন ছাড়া সকলেই শিশু। একটি বেসরকারি সংগঠনের দেয়া তথ্য মতে গত ৩ বছরে জেলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুসংখ্যা ৮৯ জন। জেলার সিভিল সার্জন বলেছেন, পানিতে ডুবে মৃত্যুহার দেশের মধ্যে সুনামগঞ্জেই বেশি। এবছর একই পরিবারের ৩ থেকে ৫ শিশু পর্যন্ত পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছে। এমনসব ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে শুক্রবার প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। হাওর ও পুকুর-ডোবা বহুল এই জেলায় শিশুদের জন্য পানি আতংক ভয়ংকর। প্রতিবছরই পানিতে ডুবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া নৌদুর্ঘটনায়ও মাঝে মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটে। জেলার সিভিল সার্জন পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে পরিবারগুলোর সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করে শিশুদের পায়ে ঝুনঝুনি জাতীয় কিছু বেঁধে রাখার পরামর্শ প্রদান করেছেন যাতে শিশুদের অবস্থান বাবা-মা জানতে পারেন।
ওই প্রতিবেদনে শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাসারচর গ্রামে শিশু মৃত্যুর অনুসন্ধান করতে যেয়ে প্রতিবেদক দেখতে পান অধিকাংশ গ্রামবাসী দরিদ্র এবং সন্তান ধারণে তাদের মধ্যে কোনো পরিকল্পনার ছাপ নেই। এই গ্রামে দম্পতিদের ৩ থেকে ১৩ জন পর্যন্ত সন্তান থাকার বাস্তবতা পাওয়া যায়। এই তথ্যটিকে আমরা অধিক গুরুত্ব দিতে চাই। পরিবারে সন্তান সংখ্যা এক বা দুইজন থাকলে যেভাবে তাদের লালন পালন যতেœর সাথে করা সম্ভব হবে সেখানে যদি ৩ থেকে ১৩ জন সন্তান থাকে তাহলে সেই যতœ দেয়া কখনও সম্ভব হবে না। দারিদ্রতার বাড়ার একটি বড় কারণও এই অধিক সন্তান জন্মদান প্রবণতা। প্রতিবেদক বলেছেন গ্রামবাসীর মধ্যে ব্যাপকভাবে পুষ্টিহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। দারিদ্রতার প্রধান অনুষঙ্গই হলো পুষ্টিহীনতা। আমাদের গ্রামীণ পরিবারগুলো সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে যদি সরকারের লক্ষের কাছাকাছি থাকতে পারত তাহলে দারিদ্রতার প্রকোপ অনেক কমে যেত বলে আমাদের বিশ্বাস। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো গ্রামগুলোতে দম্পতিপিছু অধিক সন্তান গ্রহণ এখন একটি সাধারণ দৃশ্য। আমাদের দেশে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর নামের একটি বিশাল সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য। এর পাশাপাশি বহু বেসরকারি সংগঠনও একই উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে। কার্যত এইসব প্রতিষ্ঠান পরিবার পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধকরণ বিষয়ে গত কয়েক দশকে তেমন কোনো সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সাথে পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিকে তাই সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিৎ বলে আমরা মনে করি।
জেলার ভৌগোলিক অবস্থান পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর জন্য অতিশয় ঝুঁকিপূর্ণ। এই জায়গায় অভিভাবকদের সচেতনতা ভিন্ন এই ঝুঁকি মোকাবিলার আর কোনো পথ নেই। আরেকটি ব্যবস্থা হলো শিশুদের সাঁতার শিখানো। উদ্বেগের বিষয় হলো এখন বহু পরিবারের সন্তানরা সাঁতার জানে না। সাঁতার শিখাতে অভিভাবকদের কোনো উদ্যোগ নেই। সাঁতার শিখানোর বিষয়টিকে একটি জাতীয় উদ্যোগ হিসাবে সামনে আনা উচিৎ। পানিতে ডুবে গেলে জরুরি পরিচর্যা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর গুরুত্ব বেশি। দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিষয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে পারে। একটি শিশুর পূর্ণতা পাওয়ার আগেই পানিতে ডুবে মুত্যুবরণ করার মতো দুঃখজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না। তাই এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাপকভাবে কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আমরা চাই না একটি শিশুরও পানিতে ডুবে অকাল মৃত্যু ঘটুক। যে অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করে তা অপূর্ণ রেখে চলে যাওয়ার মতো নিদারুণ বাস্তবতা থেকে জনপদ মুক্তি পাক এই আমাদের কামনা।